দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল আজহা। মাত্র কয়েকদিন পরেই মুসলমানদের অন্যতম বৃহৎ এই ধর্মীয় উৎসব। ঈদকে সামনে রেখে রাজবাড়ী জেলার পশুর হাটগুলোতে কোরবানির পশু বেচাকেনা পুরোদমে জমে উঠতে শুরু করেছে।
রোববার (২৪ মে) দুপুরে রাজবাড়ী শহরের বিনোদপুরে অবস্থিত পৌর পশুর হাটে গিয়ে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা গেছে।
বিজ্ঞাপন
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রাজবাড়ী জেলায় কোরবানির পশুর চাহিদা রয়েছে ৫০ হাজার ২৮৪টি। তবে স্থানীয় খামারিরা চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি পশু প্রস্তুত করেছেন। জেলার ৮ হাজার ৮৭২ জন খামারির গোয়ালে এবার প্রায় ৭০ হাজার গবাদিপশু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ কোরবানির জন্য প্রস্তুত রয়েছে। ফলে জেলায় এবার চাহিদার তুলনায় ১৮ হাজার ৮২৭টি পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর কোরবানিযোগ্য পশুর মধ্যে রয়েছে ২২ হাজার ৫টি ষাঁড় গরু, ২ হাজার ৮৫৪টি বলদ, ৫ হাজার ১২১টি গাভি, ২৩৬টি মহিষ, ৩৮ হাজার ৪১৪টি ছাগল, ৪১৮টি ভেড়া এবং অন্যান্য পশু ৬৩টি। কোরবানির এই বিশাল বাজারকে কেন্দ্র করে জেলায় এবার মোট ৩২টি স্থানে পশুর হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ১৭টি স্থায়ী এবং ১৫টি অস্থায়ী হাট।
বিনোদপুর পৌর পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাক, নসিমন, ভটভটিসহ নানা যানবাহনে করে ব্যবসায়ী ও খামারিরা তাদের পশু নিয়ে হাটে আসছেন। তবে বাজারে মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন

হাটে পশু কিনতে আসা ক্রেতারা বলছেন, বড় গরুর দাম তুলনামূলক কিছুটা কম মনে হলেও, ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর দাম অনেক বেশি চাওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিক্রেতারা পশুর দাম নিয়ে কিছুটা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বহরপুর থেকে ৪টি গরু নিয়ে আসা জাহিদ ব্যাপারী বলেন, আজ হাটে ক্রেতা অনেক, কিন্তু সবাই শুধু দাম শুনে চলে যাচ্ছে। আড়াই লাখ টাকার গরুর দাম বলছে মাত্র ২ লাখ টাকা। বাজারে এখন মাঝারি সাইজের গরুর দিকেই সবার নজর বেশি।
গরু ছাড়াও হাটে আকর্ষণ কাড়ছে বড় আকারের ছাগল।

কল্যাণপুর থেকে ৩৫ কেজি ওজনের একটি বড় রাম ছাগল নিয়ে আসা বাপ্পি নামের এক বিক্রেতা বলেন, আমি ছাগলটার দাম চাচ্ছি ৩৩ হাজার টাকা। ক্রেতারা ২৭ হাজার পর্যন্ত দাম করেছেন। আর সামান্য কিছু বাড়ালেই ছাগলটি বিক্রি করে দেব।
হাটে গরু কিনতে আসা ক্রেতা লোকমান হোসেন বলেন, হাটে গরুর আমদানি প্রচুর, কিন্তু বিক্রেতারা দাম ছাড়ছেন না। মাঝারি সাইজের যে গরু গত বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকায় পাওয়া যেত, এবার সেটার দাম হাঁকা হচ্ছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার ওপরে। বাজেট মেলাতে হিমশিম খাচ্ছি, আরও দু-একটা হাট দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেব।
ক্রেতা আসরাফ খান বলেন, গো-খাদ্যের দাম বাড়ার অজুহাতে খামারিরা দাম একটু বেশিই চাচ্ছেন। তবে হাটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং পরিবেশ বেশ ভালো। অনেক দরদামের পর শেষমেশ ১ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় একটা পছন্দমতো দেশাল গরু কিনলাম।

ছাগলের ক্রেতা আশরাফুল ইসলাম বলেন, ছোট পরিবারের জন্য ছাগল কিনতে এসেছি। গরুর বাজারের চেয়ে ছাগলের বাজার এবার বেশ চড়া মনে হচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ কেজি মাংস হতে পারে এমন একটা ছাগলের দাম চাচ্ছে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। বিক্রেতারা একদাম ধরে বসে আছেন, দাম ছাড়ার কোনো লক্ষণ নেই।
গৃহিণী মোছা. রেহেনা পারভীন বলেন, হাটে ছাগলের কালেকশন ভালোই। তবে গত কয়েকদিনের তুলনায় আজ দাম কিছুটা বাড়তি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ১৮ হাজার টাকায় একটা খাসি কিনলাম। বাজেট যা ছিল তার চেয়ে দুই-তিন হাজার টাকা বেশি লেগে গেল, তাও কোরবানির পশু কিনতে পেরে ভালো লাগছে।
পৌর পশুর হাটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে হাট মালিক পক্ষের প্রতিনিধি খাইরুল ইসলাম খাইরু জানান, দূর-দূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা যেন কোনো প্রকার হয়রানির শিকার না হন, সেদিকে কঠোর নজর রাখা হচ্ছে। তিনি বলেন, ঈদের আগের দিন পর্যন্ত এখানে প্রতিদিন সার্বক্ষণিক হাট বসবে। জাল টাকা শনাক্তকরণ এবং খুব স্বল্প মূল্যে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে এখানে।

সুস্থ গবাদিপশু নিশ্চিত করতে হাটগুলোতে কাজ করছে বিশেষ মেডিকেল টিম। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জন বিশ্বাস বলেন, হাটে এবার দেশি গরুর সরবরাহ সবচেয়ে বেশি। কোনো অসুস্থ পশু যেন বিক্রি না হয় সেজন্য আমাদের মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দিচ্ছে। আশা করছি, খামারিরা এবার তাদের পশুর ভালো দাম পাবেন।
পশুর হাটের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজবাড়ীর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ বলেন, কোরবানির পশুবাহী ট্রাক কোনো হাটে যাওয়ার পথে কেউ আটকাতে পারবে না। প্রতিটি হাটে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর নজরদারি রয়েছে এবং জাল টাকা শনাক্তকরণের জন্য বিশেষ টিম কাজ করছে।
সব মিলিয়ে, কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে রাজবাড়ীর পশুর হাটগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে কোরবানির পশু কেনাবেচা।
প্রতিনিধি/এসএস




