ডা. মানসী রানী সরকার। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষে ২০১০ সালে এডহক (অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত) মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন।
পরে তদবির ও প্রভাব খাটিয়ে ২০২৪ সালের ২৮ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদফতরের ৩৮১ নম্বর স্মারকের প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পান বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই নিজেকে হাসপাতালের প্রধান কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিয়ে দুর্নীতি, অনিয়ম, অসদাচরণ ও লুটপাটে জড়িয়ে পড়েন তিনি। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির প্রতিকার চেয়ে হাতিয়া পৌরসভার চরকৈলাশ গ্রামের মো. সবুজ আহাম্মেদ স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে গত মঙ্গলবার (১৯ মে) সরেজমিন তদন্তে আসে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তবে তদন্তের তিন দিন পার হলেও ডা. মানসী রানী এখনো আগের মতোই দায়িত্ব পালন করছেন এবং নিজেকে ইউএইচএফপিও হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন বলে হাসপাতাল সূত্র জানায়।

তদন্ত টিমের নেতৃত্ব দেন লক্ষ্মীপুরের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন। টিমের অন্য সদস্যরা হলেন—লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন অফিসের অ্যাসিস্ট্যান্ট চিফ স্ট্যাটিসটিক্যাল অফিসার (ইনচার্জ) এ. এইচ. এম. ফারুক এবং লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. অরূপ পাল।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগে বলা হয়, গুরুত্বপূর্ণ এ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিচালনায় ডা. মানসী রানী অদক্ষ হলেও দুর্নীতি ও অনিয়মে তিনি বেপরোয়া। সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার, নার্স ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে প্রায়ই অসদাচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, অফিস সহকারী কাম-কম্পিউটার অপারেটর কামরুল হোসেনের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়মের সূত্রপাত হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, কামরুল মাসের পর মাস অনুপস্থিত থাকলেও নগদ অর্থের বিনিময়ে তার বেতন-ভাতাদি পরিশোধ করা হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতা কর্মী সাদ্দাম হরিজনকে মাসের পর মাস অনুপস্থিত দেখিয়ে তার বেতনের বড় অংশ আত্মসাৎ করার অভিযোগও রয়েছে ডা. মানসী রানীর বিরুদ্ধে।
সাবেক ক্যাশিয়ার ও স্টোরকিপার (বর্তমানে কবিরহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত) আমিরুল ইসলাম আকরামের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ লেনদেন করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে হাতিয়া পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সোহরাব, মিরাজ ও পারভীন নামের কয়েকজন ভুক্তভোগী তদন্ত টিম ও সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালে সিকিউরিটি গার্ড পদে চাকরির আশ্বাস দিয়ে তাদের কাছ থেকে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়।
ভুক্তভোগী মিরাজ জানান, তৎকালীন ক্যাশিয়ার আকরামের মাধ্যমে তিনি ৩০ হাজার টাকা দেন এবং ১১ মাস কাজও করেন। পরে তাকে বাদ দেওয়া হলেও এখনো টাকা ফেরত পাননি। আকরাম সরকারি ওষুধ সংগ্রহ ও সরবরাহে ব্যাপক কারসাজি করতো বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া, হাতিয়া স্বাস্থ্য বিভাগের ছয়টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের পুকুর ও জমি ইজারার নামে টাকা নিয়ে তা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। তমরুদ্দি ও বুড়িরচর সাব-সেন্টারের পুকুর ও জমি ইজারার নামে প্রায় ৯০ হাজার টাকা গ্রহণ করা হলেও তা সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
মা-মনি প্রকল্পের সার্জন, নার্স ও আয়াদের কাছ থেকে হাসপাতালের কোয়ার্টার ভাড়া নিয়ে তা ব্যক্তিগতভাবে ভোগ করার অভিযোগও উঠেছে ডা. মানসী রানীর বিরুদ্ধে।
হাতিয়ায় কাগজে-কলমে ছয়টি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার থাকলেও বাস্তবে চারটি চালু রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তমরুদ্দি সাব-সেন্টার ছাড়া অন্য কেন্দ্রগুলো সপ্তাহে মাত্র এক-দুই দিন এবং অল্প সময়ের জন্য খোলা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, ডা. মানসী রানী নিজে পরিদর্শনে না গিয়ে পরিদর্শন খাতায় স্বাক্ষর করে টিএ/ডিএ উত্তোলন করতেন।
অভিযোগে বলা হয়, হাসপাতালের রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি অকার্যকর রেখে প্রাইভেট ল্যাব থেকে মাসোহারা নেয় ডা: মানসী। হাসপাতালের অভ্যন্তরে ফল-ফলাদি একক ভোগসহ তিনি পুকুর ব্যবস্থাপনায়ও করেন অনিয়ম।
হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা নার্সদের ছাড়পত্র আটকে রেখে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হতো। এসব আর্থিক লেনদেন হাসপাতালের বর্তমান হিসাবরক্ষক নজরুল ইসলামের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

এমসিডি কর্নার ও জরুরি বিভাগের ভ্যাকসিন এবং ইনজেকশন সংরক্ষণের ফ্রিজসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ডা: মানসী ব্যক্তিগত বাসায় ব্যবহার করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারী মো. সবুজ আহাম্মেদ নিজেকে সচেতন নাগরিক দাবি করে বলেন, ভুক্তভোগীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে তিনিও ডা. মানসী রানীর অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের সুষ্ঠু তদন্ত এবং অপসারণ চান। একই অভিযোগের অনুলিপি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর পাঠানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মানসী রানী সরকার বলেন, আমি এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
তদন্ত টিমের প্রধান ও লক্ষ্মীপুর সিভিল সার্জন মোহাম্মদ আবু হাসান শাহীন বলেন, অভিযুক্ত ভারপ্রাপ্ত উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অভিযোগকারী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। এরপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে হাতিয়ার সচেতন মহল ডা. মানসী রানী সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, বিচার ও অপসারণ দাবি করেছেন।
এআরএম




