চারদিকে যখন ঈদের আনন্দ। কেউ নতুন জামা পরে ঘুরতে বের হয়েছে, কেউ পরিবারের সঙ্গে গল্পে মেতে উঠেছে। রান্নাঘরে সেমাই আর পোলাওয়ের ঘ্রাণ, শিশুদের হাসি, আত্মীয়দের আনাগোনায় মুখর প্রতিটি ঘর। কিন্তু এই আনন্দের বাইরেও কিছু মানুষ আছেন, যাদের ঈদ মানেই দায়িত্ব। যাদের উৎসব মানেই হাসপাতালের করিডোর, সাইরেনের শব্দ আর জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ। তেমনই একজন মো. ইরফাত আলী।
২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ইরফাত আলী গত ৫ বছর ধরে নিজের পরিবারকে সময় না দিয়ে মানুষের জীবন বাঁচানোর কাজে নিয়োজিত আছেন। ৫ বছরে তিনি ১০টি ঈদ পেয়েছেন, কিন্তু একটিও ঈদ পরিবারের সঙ্গে কাটাতে পারেননি।
বিজ্ঞাপন
ইরফাত আলী বলেন, ঈদের দিনে ডিউটিতে থাকলে বউ-বাচ্চারা ফোন দেয়। বলে, ‘তুমি কোথায়? বাসায় আসবা না?’ তখন খুব কষ্ট লাগে। কিন্তু কিছু করার থাকে না। কথাগুলো বলার সময় তার চোখে যেন লুকানো কষ্ট স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ঈদের সকাল অন্যদের কাছে আনন্দের হলেও আমার কাছে সেটি দায়িত্বের আরেকটি দিন। কারণ, যেকোনো মুহূর্তে একটি ফোনকল আসতে পারে, আর সেই ফোনকলের ওপাশে থাকতে পারে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা কোনো মানুষ।
তিনি আরও বলেন, যখন রোগীর পরিবারের ফোন আসে, তখন নিজের কথা ভাবার সময় থাকে না। শুধু মনে হয়, যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে হাসপাতালে নিতে হবে। কারণ কয়েক মিনিট দেরি মানে হয়ত একটা জীবন শেষ হয়ে যাওয়া।
বিজ্ঞাপন
একজন অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভারের জীবনটা বাইরে থেকে যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে ততটাই কঠিন। রাস্তায় যানজট, মানুষের অসচেতনতা, রাতভর ডিউটি সবকিছুর মাঝেও তাদের ছুটে চলতে হয় শুধুমাত্র একজন মানুষকে বাঁচানোর আশায়।

ইরফাত আলী বলেন, আমি আমার দায়িত্বকে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। কারণ এই অ্যাম্বুলেন্সের কারণেই হয়ত কোনো মা তার সন্তানকে ফিরে পায়, কোনো সন্তান তার বাবাকে ফিরে পায়। তবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের পরিবারের জন্য সময় না দিতে পারার কষ্ট আমাকে প্রতিনিয়ত নাড়া দেয়।
তিনি বলেন, ঈদের দিন পরিবারের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যেতে পারি না। বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দ করতে পারি না। মনে খুব কষ্ট লাগে। সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে তখন, যখন বাসা থেকে ফোন আসে। ওরা বলে, ‘আমরা সবাই মিলে ভালো খাবার খাচ্ছি, তুমি কী খাইছো?’ তখন বুকের ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে।

তিনি আরও বলেন, সামনে ঈদ। অথচ এই ঈদেও পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ পাব না। যখন পুরো শহর ঈদের আনন্দে ব্যস্ত, তখন ইরফাত আলীর মতো মানুষগুলো অ্যাম্বুলেন্সের স্টিয়ারিং ধরে ছুটে চলেন জীবনের খোঁজে। তাদের ত্যাগের গল্প হয়ত খুব বেশি আলোচনায় আসে না, কিন্তু এই মানুষগুলোর কারণেই অসংখ্য পরিবার ফিরে পায় তাদের প্রিয়জনকে।
প্রতিনিধি/এসএস




