পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে এলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় গ্রামীণ জনপদের ঐতিহ্যবাহী কামারপাড়া। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার সেই কামারপাড়ায় এখন আগুনের লেলিহান শিখা, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর হাতুড়ির টুংটাং শব্দে মুখর চারপাশ। কোরবানির প্রস্তুতিতে দা, বঁটি, ছুরি ও চাপাতি তৈরির ব্যস্ততায় দিন-রাত এক করে কাজ করছেন কামাররা। পুরোনো সরঞ্জামে নতুন ধার বসাতে ক্রেতাদের ভিড়ও বাড়ছে প্রতিদিন। শত বছরের এই ঐতিহ্য যেন ঈদকে ঘিরে আবারও জেগে উঠেছে নতুন উদ্যমে।
রোববার (১৭ মে) সকালে বীরগঞ্জ পৌর এলাকার স্লুইচগেট রোডের ডাবলু মার্কেটে গিয়ে দেখা যায়, কামারপাড়ার প্রতিটি কর্মশালায় চলছে তুমুল ব্যস্ততা। কোথাও জ্বলছে আগুনের চুল্লি, কোথাও লাল হয়ে ওঠা গরম লোহায় হাতুড়ির আঘাতে তৈরি হচ্ছে নতুন দা-বঁটি। আবার কোথাও পুরোনো ছুরি, চাপাতি ও কাঁচিতে নতুন করে ধার বসাতে ভিড় করছেন ক্রেতারা।
বিজ্ঞাপন
কর্মশালাগুলোর চারপাশে আগুনের উত্তাপ, ধোঁয়ার কুণ্ডলী আর লোহার ঝনঝন শব্দ মিলিয়ে যেন তৈরি হয়েছে এক জীবন্ত শিল্পচিত্র। শ্রমিকদের নিরলস পরিশ্রম আর ঘামের বিনিময়ে তৈরি হচ্ছে কোরবানির জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
কামার মো. শাহ আলম বলেন, ঈদুল আজহার সময় আমাদের কাজ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। এখানে ৬ জন কারিগর কাজ করছেন। কেউ নতুন সরঞ্জাম তৈরি করছেন, কেউ আবার পুরোনো জিনিসে শান দিচ্ছেন।

বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, এই মৌসুমে প্রতিদিন কয়েক হাজার টাকার কাজ হয়। তবে লাভ খুব বেশি থাকে না। মানুষের প্রয়োজনের কথা ভেবে কম লাভেই কাজ করতে হয়।
ক্রেতা মো. হামিদ বলেন, ঈদের আগে সব সরঞ্জাম ঠিক করে রাখি। সারা বছর ব্যস্ততার কারণে সময় পাওয়া যায় না। তাই এখন একসঙ্গে সব কাজ করিয়ে নিচ্ছি।
স্থানীয়দের মতে, কোরবানির ঈদকে ঘিরে কামারপাড়ায় এখন উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। আশপাশের গ্রাম ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসছেন দা, বঁটি ও ছুরি তৈরি কিংবা ধার করাতে।
ঐতিহ্যবাহী কামারশিল্প শুধু প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরির কাজই নয়, এটি গ্রামীণ অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়লেও ঈদুল আজহার মৌসুমে দেশীয় কামারশিল্পের চাহিদা এখনো উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
লোহার টুংটাং শব্দে মুখর বীরগঞ্জের কামারপাড়া যেন জানান দিচ্ছে ঈদুল আজহাকে ঘিরে প্রস্তুত হচ্ছে পুরো গ্রামীণ জনপদ। যেখানে শ্রম, ঐতিহ্য আর জীবিকার এক অনন্য মেলবন্ধনে আজও বেঁচে আছে বাংলার প্রাচীন কামারশিল্প।
প্রতিনিধি/এসএস




