রাত গভীর। হাসপাতালের ইমারজেন্সি ওয়ার্ডে চলছিল রোগীদের চিকিৎসাসেবা। হঠাৎ চিৎকার-চেঁচামেচি আর দৌড়াদৌড়িতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে। এক রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষুব্ধ স্বজনদের হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগ। এ সময় কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলামকে পাথর, লাঠি ও কিল-ঘুষি দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। হামলায় আহত হন আরও এক অফিস সহায়ক ও পাঁচ আনসার সদস্য।
শুক্রবার (১৫ মে) দিবাগত রাত ১টার দিকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের ইমারজেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
গুরুতর আহত চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলাম বর্তমানে সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

আহতরা হলেন সদর হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. নাসির ইসলাম (২৯), অফিস সহায়ক এসকেন্দার শেখ (৫৮), আনসার গার্ড কমান্ডার এপিসি আব্বাস আলী (৪৬), আনসার সদস্য সোহেল সরদার (২৫), কামরুল (৩০), আজিজুল হক (২৬) ও কাউসার (২৮)। অন্য আহতরা প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছেন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শরীয়তপুর পৌরসভার উত্তর বিলাসখান এলাকার লাল মিয়া কাজী হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শুক্রবার রাত ১০টার দিকে সদর হাসপাতালে ভর্তি হন। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোগীর অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরিবারের সদস্যরা রাতে ঢাকায় নিতে রাজি হননি। পরে রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে লাল মিয়া কাজী মারা যান।
বিজ্ঞাপন

রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকের অবহেলায় মৃত্যু হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন স্বজনরা। অভিযোগ রয়েছে, রাত ১টার দিকে ৭০ থেকে ৮০ জনের একটি দল হাসপাতালের ইমারজেন্সি অবজারভেশন ওয়ার্ডে ঢুকে চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলামের ওপর হামলা চালায়। হামলাকারীরা পাথর ও লাঠি দিয়ে তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে। এ সময় চিকিৎসককে রক্ষা করতে গেলে অফিস সহায়ক ও দায়িত্বরত আনসার সদস্যদেরও মারধর করা হয়। হামলার সময় হাসপাতালে ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ উঠেছে।
আহত চিকিৎসক ডা. নাসির ইসলাম বলেন, রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বজনরা রাতে নিতে চাননি। পরে রোগীর মৃত্যুর খবর শুনে কয়েকজন হঠাৎ আমার কক্ষে ঢুকে হামলা চালায়। একজন পাথর দিয়ে মাথায় আঘাত করে। অন্যরাও মারধর করে।

অফিস সহায়ক এসকেন্দার শেখ বলেন, স্যারকে বাঁচাতে গেলে আমাকেও মারধর করা হয়। জামা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আমরা এই হামলার বিচার চাই।
এ ঘটনায় সোলাইমান কাজী (আল আমিন) ও জসীম উদ্দিন নামে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ। তবে আটক সোলাইমান কাজী দাবি করেন, তার মামা চিকিৎসকের অবহেলায় মারা গেছেন। হামলার ঘটনায় নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে তিনি বলেন, আমি ঘটনাস্থলে ছিলাম না।
শরীয়তপুর সদর উপজেলার পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, এ ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। মামলার প্রস্তুতি চলছে। আটক দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

শরীয়তপুরের সিভিল সার্জন ডা. রেহান উদ্দিন বলেন, চিকিৎসক নাসির ইসলামের অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে ঢাকা মেডিকেলে রেফার করা হয়েছে। হামলার ঘটনায় চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, চিকিৎসকদের ওপর এমন হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত না হলে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রতিনিধি/এসএস




