শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ঢাকা

নিজের কবর পরিচর্যায় মগ্ন আব্দুর লতিফ, করেছেন চল্লিশাও

তোফায়েল হোসেন জাকির, গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ১৬ মে ২০২৬, ০১:০৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নিজের কবর পরিচর্যায় মগ্ন আব্দুর লতিফ, করেছেন চল্লিশাও
আব্দুর লতিফ সরকার।

নিভৃত গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দা আব্দুর লতিফ সরকার। বয়স প্রায় ৬০ বছর ছুঁই ছুঁই। একটি ভূমি অফিসে কর্মরত তিনি। এরই মধ্যে নিজের কবর আগেই প্রস্তুত রেখেছেন। তাও আবার নিজ হাতেই নির্মিত। আর এ কবরস্থানটি প্রত্যেকদিন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় মগ্ন থাকেন লতিফ সরকার।

তার বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার সাহাপাড়া ইউনিয়নের খামারপীরগাছা গ্রামে। বর্তমানে খোলাহাটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত আছেন।


বিজ্ঞাপন


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আব্দুল লতিফ সরকার ১৯৮৫ সালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে মাস্টার রোলে চাকরিতে যোগ দেন। পরে ১৯৮৯ সালে চাকরি সরকারীকরণ হয়। এরপর ২০০৭ সালে প্রথম নিজের কবর নিজ হাতে নির্মাণের চিন্তা মাথায় আসে লতিফের। কয়েক বছর পরিকল্পনার পর ২০১১ সালে বাড়ির সামনের একটি ছোট পুকুর ভরাট করে শুরু করেন কবর নির্মাণের কাজ। কবরের আকার, নকশা ও পরিমাপ নিজেই নির্ধারণ করেন। পরে নিজ হাতে কবর খনন করে ধাপে ধাপে রাজমিস্ত্রীর সহায়তায় ইটের কাজ, পিলার ও গম্বুজ আকৃতির কাঠামো নির্মাণ করেন। সময়ের সঙ্গে বসিয়েছেন টাইলসও। হাতে অতিরিক্ত অর্থ এলেই ব্যয় করেছেন কবরের সৌন্দর্য বাড়াতে।

2fdccb63-415e-459b-815a-951b2ba33dd3

শুধু কবর নির্মাণেই থেমে থাকেননি তিনি। মৃত্যুর পরের আনুষ্ঠানিকতার প্রস্তুতিও আগে-ভাগেই সম্পন্ন করেছেন। ২০১৩ সালে গ্রামের মানুষদের দাওয়াত দিয়ে নিজের “চল্লিশা” পর্যন্ত আয়োজন করেন। দাফনের কাপড় কিনে নিজ হাতে কেটে প্রস্তুত করে রেখেছেন। এমনকি মৃত্যুর পর গোসলের জন্য প্রয়োজনীয় সাবান, গোলাপজলসহ বিভিন্ন সামগ্রীও সংগ্রহ করে রেখেছেন।

আরও পড়ুন

পলিব্যাগ খুলতেই মিলল মানুষের হাত-পা

প্রতিদিন ফজরের নামাজ আদায় শেষে প্রথমেই নিজের কবর দেখতে যান আব্দুল লতিফ। কোথাও ময়লা বা অগোছালো কিছু চোখে পড়লে নিজেই পরিষ্কার করেন। পরিবারের সদস্যদেরও বলে রেখেছেন, মৃত্যুর পর তাকে যেন এই কবরেই দাফন করা হয় এবং কবরের পরিচ্ছন্নতা নিয়মিত বজায় রাখা হয়।

স্বজনরা জানায়, দীর্ঘদিন ধরেই নিজের কবর নিজ হাতে তৈরি করার ইচ্ছা ছিল তার। সেই লক্ষ্যেই এক যুগ আগে শুরু করেন, তবে তার ইচ্ছার প্রতি সম্মান জানিয়ে মৃত্যুর পর তাকে ওই কবরেই দাফনের প্রস্তুতি নিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

আব্দুর লতিফ সরকারের নাতি আবু হানিফ শেখ বলেন, দাদি মারা যাওয়ার পর আমিসহ আমার পরিবারের ভাইয়েরা মিলে তার গোসলসহ খাটলি ধরার সব কাজ আমরাই করব। এই কথা আমি আগেই দাদাকে বলে রেখেছি। এলাকাবাসীর চোখে বিষয়টি যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি ইতিবাচকও। রাস্তার পাশেই নির্মিত হওয়ায় প্রতিদিনই কৌতূহলী মানুষ ভিড় করছেন কবরটি দেখতে।

b06acff9-ef59-4d66-921d-b4774e21bee0

আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, আমার বিশ্বাস, সারা জীবনের ইবাদতের মধ্যে কোনো একটি ইবাদত কবুল হওয়ার কারণেই আল্লাহ তাকে নিজের কবর নিজ হাতে নির্মাণ করার সুযোগ দিয়েছেন। এ থেকেই তিনি একাজটি সম্পূর্ণ করেছেন। সবার কাছে দোয়া চান তিনি।

গাইবান্ধার সাহাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ম‌শিউর রহমান সরকার বলেন, ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবেই এলাকায় পরিচিত আব্দুল লতিফ। অবসরের অধিকাংশ সময় তিনি ইবাদত-বন্দেগিতে কাটান। নিজের কবর নিজে তৈরি করে যাওয়াকে তারা তার দীর্ঘদিনের সাধনা ও পরকালীন প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই দেখছেন।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর