বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

সহকর্মীদের বেতন জোগাতে নৌকার মাঝি প্রধান শিক্ষক

সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশিত: ১৩ মে ২০২৬, ১১:১৬ এএম

শেয়ার করুন:

সহকর্মীদের বেতন জোগাতে নৌকার মাঝি প্রধান শিক্ষক
ইঞ্জিনচালিত নৌকায় শিক্ষার্থী ও পর্যটক নিয়ে প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন।

বান্দরবানের থানচির দুর্গম তিন্দু ইউনিয়নে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করতে এক অনন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন। শিক্ষার্থীদের বেতনের সামর্থ্য না থাকায়, তিনি ছুটির দিনে পর্যটকদের ইঞ্জিনচালিত নৌকা চালিয়ে নিজের ও সহকর্মীদের বেতন জোগাচ্ছেন। নিরহংকারী এই শিক্ষকের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও আত্মত্যাগে পাহাড়ের বুকে টিকে আছে একটি নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়। দুর্গম পাহাড়ের বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে আর সহকর্মীদের বেতন জোগাতে কলমের সঙ্গে সঙ্গে এখন নৌকার হাল ধরেছেন এই অকুতোভয় শিক্ষক। দুর্গম এলাকার কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যতের আশার আলো দেখাচ্ছে বিদ্যালয়টি।

জানা গেছে, জেলা সদর থেকে প্রায় ৮৮ কিলোমিটার এবং উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত তিন্দু নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়টি ২০২০ সালে এলাকার কিছু শিক্ষানুরাগীর প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়। একই বছর প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদেন বামং খিয়াং মিংলেন। তিনি কক্সবাজার সিটি কলেজ থেকে ২০১৮ সালে এমবিএ এবং পরে কক্সবাজার টিচার্স ট্রেইনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৬ শিক্ষক অল্পবেতনে নিয়মিত পাঠদান করছেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষার মাধ্যমে ৮ শিক্ষক ও ৫ কর্মচারী নিয়োগের সুযোগ থাকলেও আর্থিক সংকটের কারণে ২ শিক্ষক নন-পেমেন্ট ভিত্তিতে রাখা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদেরও বিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যালয়টি ২০২১ সালে স্থাপনের অনুমোদন পায়। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ৬ষ্ঠ থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত ৫৬ শিক্ষার্থী রয়েছে। চলতি বছর ৯ম শ্রেণি চালু করা হয়েছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সবার সহযোগিতা কামনা করেছেন প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং।


বিজ্ঞাপন


ce3f972e-3816-447b-a79b-204fc128f5b8

প্রধান শিক্ষক বামং খিয়াং মিংলেন ঢাকা মেইলকে জানান, বিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় নিয়মিত বেতন আদায় সম্ভব হয় না। ফলে শিক্ষকদের বেতনভাতা দেওয়া শুরু থেকেই বড় চ্যালেঞ্জ। এ অবস্থায় থানচি উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া একটি ইঞ্জিনচালিত বোট দিয়ে প্রতি শুক্রবার, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিনে থানচি থেকে তিন্দু বড় পাথর, রেমাক্রী ফলস রুটে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করেন তিনি।

তিনি বলেন, অন্য চালক রাখলে আলাদা মজুরি দিতে হয়, চালক অনেক সময় আয়ের টাকা গোপন রাখে। সেজন্য তিনি নিজেই চালক হলে সেই টাকাটা বাঁচে, যা দিয়ে তিনি শিক্ষকদের বেতন হিসেবে দিতে পারেন।

তিনি জানান, গত মার্চ থেকে এপ্রিল পর্যন্ত এই বোট দিয়ে পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করে ৪৯ হাজার ১০০ টাকা আয় হয়েছে। এরমধ্যে ৩০ হাজার টাকা শিক্ষকদের সমানভাগে বেতন-ভাতা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। শুধু শিক্ষকদের বেতনই নয়, শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া এবং সাঙ্গু নদী পারাপারেও নিজেই দায়িত্ব পালন করেন তিনি।


বিজ্ঞাপন


তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পাওয়াই ম্রো বলেন, বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়েও তার মধ্যে কোনো অহংকার নেই। বরং তিনি নিজেই ইঞ্জিনচালিত বোট চালিয়ে যা আয় করেন এবং সেই আয়ের অর্থ বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষকের মধ্যে সমানভাবে বণ্টন করে দেন।

তিনি আরও বলেন, এই সামান্য অর্থ দিয়েই আমরা কোনো রকমে সংসার পরিচালনা করছি এবং শিক্ষার্থীদের পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। এজন্য আমরা প্রধান শিক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞ।

27a7af48-455c-4eaa-877d-86b2fb6643dc

তিন্দু নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মেওয়াই মারমা জানায়, আমাদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমাদের জন্য অনেক কষ্ট করছেন। তিনি সবসময় বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের কথা ভাবেন। এজন্য আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। প্রধান শিক্ষক শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নন, বরং শিক্ষক পাশে দাঁড়িয়ে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে নিজেকে এক অনন্য উদাহারণ হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

তিন্দু ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মংপ্রু অং মারমা জানান, তিনি চেয়ারম্যান থাকাকালে ইউনিয়নের টোল-টেক্সের অর্থ বিদ্যালয় তহবিলে দিয়ে শিক্ষকদের বেতন দেওয়া হতো। বর্তমানে উপজেলা প্রশাসনের দেওয়া বোটের আয় থেকেই বিদ্যালয়টি কোনোমতে চলমান রয়েছে।

থানচি উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াই হ্লা মং মারমা বলেন, দুর্গম এলাকায় প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে উচ্চবিদ্যালয় থাকা উচিত বিবেচনায় বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা হয়েছিল। বিদ্যালয়টি উজ্জ্বল ভবিষৎ কামনা করি।

 

থানচি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল ঢাকা মেইলকে বলেন, দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই দরিদ্র হওয়ায় বিদ্যালয়ের নিয়মিত আয় নেই। তাই টেকসই সমাধান হিসেবে তিন্দু ও রেমাক্রি এলাকায় দুটি বিদ্যালয়কে দুটি ইঞ্জিন চালিত বোট দেওয়া হয়েছিল, যাতে পর্যটক পরিবহন করে যা আয় হয় তা দিয়ে শিক্ষকদের নূন্যতম বেতন দেওয়া যায়। সামনে আরও একটি বোট প্রদান করার চিন্তাভাবনা রয়েছে এবং বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকবে। 

তিনি আরও জানান, বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস সংস্কার করা হয়েছে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড এর মাধ্যমে ভবন নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকেও সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়টি টিকিয়ে রাখতে উপজেলা পরিষদ থেকে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রতিনিধি/টিবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর