সোমবার, ১১ মে, ২০২৬, ঢাকা

রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারের আঙুর বিপ্লব

রাজবাড়ীতেই ফলছে ২০৪ জাতের বিদেশি আঙুর

কাজী তানভীর মাহমুদ, রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ১১ মে ২০২৬, ০৬:১৭ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজবাড়ীতেই ফলছে ২০৪ জাতের বিদেশি আঙুর

‘বাংলাদেশের মাটিতে মিষ্টি আঙুর হয় না’ দীর্ঘদিনের এই প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার তরুণ উদ্যোক্তা ফারদিন আহমেদ। 

পেশায় রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ার হলেও কৃষির প্রতি প্রবল ঝোঁক থেকে তিনি গড়ে তুলেছেন এক বিশাল আঙুর বাগান। দেড় বিঘা জমিতে ২০৪ জাতের আঙুর চাষ করে তিনি এখন সারা দেশের কৃষি উদ্যোক্তাদের নজর কেড়েছেন।


বিজ্ঞাপন


ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রোবটিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা করা ফারদিনের এই যাত্রার শুরুটা ছিল বেশ চ্যালেঞ্জিং। ২০২০ সালে করোনা মহামারীর সময় ঢাকা থেকে নিজ গ্রাম গোয়ালন্দের ছোটভাকলা ইউনিয়নের কুঠি পাঁচুরিয়ার মোল্লাপাড়ায় ফিরে আসেন তিনি। শখ করে বাড়ির উঠানে একটি আঙুর গাছ লাগালেও প্রথমবার ফলন আশানুরূপ বা মিষ্টি হয়নি।

তবে দমে না গিয়ে ফারদিন ইন্টারনেট ও বিদেশি বিভিন্ন কৃষি ব্লগের তথ্য কাজে লাগিয়ে গবেষণা শুরু করেন। বাড়ির পাশেই গড়ে তোলেন ‘গ্রেপ ইঞ্জিনিয়ারিং এগ্রো অ্যান্ড রিসার্চ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। ২০২৫ সালের মে মাসে দেড় বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তার বাগানে রাশিয়ান বাইকোনুর, ইউক্রেনের ভ্যালেজ, জাপানি রুবিরোমান, ল্যাম্বরগিনি ও ব্লাক ম্যাজিকসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২০৪ জাতের ৫০০টি গাছ রয়েছে।

আধুনিক ‘মাচা’ পদ্ধতি এবং সঠিক জাত নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন, এ দেশের আবহাওয়াতেও বিশ্বমানের মিষ্টি আঙুর উৎপাদন সম্ভব। ফারদিন কেবল আঙুর উৎপাদনই করছেন না, বরং উন্নত জাতের চারা উৎপাদন করে তা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সারা দেশের কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। ফল ও চারা বিক্রি থেকে বর্তমানে তার বড় অঙ্কের আয় হচ্ছে।

rajbari-grap-4


বিজ্ঞাপন


ফারদিনের এই সাফল্য দেখতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থী ও কৃষি শিক্ষার্থীরা ভিড় করছেন। ফরিদপুর থেকে আসা দর্শনার্থী আশরাফুল ইসলাম ও কৃষি শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান জানান, ল্যাম্বরগিনি বা ব্ল্যাক ম্যাজিকের মতো বিদেশি জাতগুলো দেশের মাটিতে এত সফলভাবে ফলানো সম্ভব, তা এখানে না আসলে বিশ্বাস করা কঠিন। বাগানের কর্মচারী ও স্থানীয় কৃষকদের মতে, ফারদিনের এই উদ্যোগ এলাকায় অনেকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে এবং অন্যদের আঙুর চাষে উৎসাহিত করছে।

নিজের এই অসাধ্য সাধনের গল্প বলতে গিয়ে ফারদিন আহমেদ বলেন, ‘শুরুতে বিফল হলেও প্রকৌশলবিদ্যার ছাত্র হওয়ায় আমি হাল ছাড়িনি। নিবিড় গবেষণার পর প্রায় সাড়ে ১৩ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে এই বাগান গড়ে তুলেছি। শুরুতে অনেকে হাসাহাসি করলেও এখন ফলন দেখে সবাই অবাক হচ্ছেন।’ 

কৃষি বিভাগের প্রতি আক্ষেপ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পুরো বাগানটি নিজের প্রচেষ্টায় গড়ে তুলেছি, তবে সরকারি কারিগরি সহায়তা পেলে এই খাতকে আরও এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে ফারদিন জানান, তিনি আরও সাড়ে ৪ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ‘বাইকোনুর’ জাতের চাষ শুরু করেছেন। এছাড়া বাগানটিকে ঘিরে একটি আধুনিক রিসোর্ট গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।

রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক ড. মো. শহিদুল ইসলাম ফারদিনের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘ফারদিনের বাগান প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের মাটি আঙুর চাষের উপযোগী। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।’

td

সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা ও কারিগরি সহায়তা পেলে ফারদিনের মতো তরুণদের হাত ধরে বাংলাদেশ আঙুর আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভবিষ্যতে রপ্তানির পথেও এগিয়ে যেতে পারে।

প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর