আভিজাত্য আর ঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধনের নাম মুন্সিগঞ্জের মিরকাদিমের সাদা ধবল গরু। প্রায় ২০০ বছরের প্রাচীন এই ঐতিহ্য আজও টিকে আছে রাজধানী ঢাকার পাশেই শীতলক্ষা ও ধলেশ্বরী তীরের এই জনপদে।
পবিত্র ঈদুল আযহা ঘনিয়ে আসতেই শৌখিন ও ধনাঢ্য ক্রেতাদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে মিরকাদিমের খামারগুলো। কেবল একটি পশু কেনা নয়, বরং বংশপরম্পরায় চলে আসা পারিবারিক আভিজাত্য বজায় রাখতেই বংশাল, লালবাগ ও রহমতগঞ্জের মতো পুরান ঢাকার বড় ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর ছুটে আসেন এই বিশেষ জাতের সাদা গরুর খোঁজে।
বিজ্ঞাপন
কথিত আছে, এক সময় মিরকাদিম ছিল নৌ-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু, যাকে বলা হতো ‘দ্বিতীয় কলকাতা’। সেই স্বর্ণযুগে এখানকার তেলের মিলের টাটকা খৈল এবং চালের চাতালের কুঁড়ো খেয়ে বেড়ে উঠত বিশেষ জাতের গরু। আজও সেই ধারাকে লালন করছেন কিছু প্রান্তিক খামারি।
এখানকার বিশেষত্ব হলো পশুকে ইনজেকশন বা ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে মোটাতাজা করা হয় না। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে খৈল, ভুষি, খুদ আর জাউ খাইয়ে পরম মমতায় গরুগুলোকে পালন করা হয়। বিশেষ করে নেপালি, হাঁসা, পশ্চিমা ও সিন্ধি জাতের গরু যখন ধবধবে সাদা রঙের হয়, তখন এর কদর বেড়ে যায় বহুগুণ।
শনিবার মিরকাদিমের বিভিন্ন খামার ঘুরে দেখা যায়, খামারিরা শেষ মুহূর্তের পরিচর্যায় ব্যস্ত। তবে এবারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে খামারিদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। পশুখাদ্যের চড়া দামের প্রভাবে গত বছরের তুলনায় এবার প্রতিটি গরুর দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন
ক্রেতারা বলছেন, গত বছর যে ওজনের গরু দেড় থেকে পৌনে দুই লাখ টাকায় পাওয়া যেত, এবার তার দাম চাওয়া হচ্ছে দুই লাখ টাকার উপরে। তবুও ঐতিহ্যের টানে দামের এই ফারাককে খুব একটা আমলে নিচ্ছেন না অনেক শৌখিন ক্রেতা। অনেক ব্যবসায়ী হাটে ওঠার আগেই সরাসরি খামারে এসে গরু পছন্দ করে অগ্রিম টাকা দিয়ে যাচ্ছেন, যেন পছন্দের ‘ধবল গরু’ হাতছাড়া না হয়।
পুরান ঢাকার বাসিন্দাদের কাছে মিরকাদিমের গরুর বিশেষ আকর্ষণ এর মাংসের স্বাদ। প্রাকৃতিক খাদ্যাভ্যাস আর যত্নের কারণে এই গরুর মাংস অত্যন্ত মোলায়েম ও সুস্বাদু হয়। কোনো কোনো পরিবার আজও এই সাদা গরু দিয়ে তিন দিন ধরে মাংস বিতরণের মাধ্যমে নিজেদের পারিবারিক ঐতিহ্য ধরে রাখেন। তবে শিল্পের বিকাশ ও আধুনিকায়নের ফলে কমে আসছে চাতাল আর তেলের মিল, সেই সাথে পাল্লা দিয়ে কমছে ঐতিহ্যবাহী এই গরুর পালকের সংখ্যাও।
রাজধানীর বংশাল এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ চৌধুরী, বংশ-পরম্পরার দীর্ঘদিনের রীতি নীতি ধরে রাখতেই কোরবানির পশু কিনতে প্রতি বছরের মতই এবারও এসেছেন মিরকাদিমে, বিগত বেশ কয়েক বছরের তুলনায় এবার গরুর দাম কিছুটা বেশি বলে অভিযোগ তার।
তিনি বলেন, গেল বছর প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন মন ওজনের একটি ধবল গরু কিনেছি ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকায়, তবে এ বছর একই গরুর দাম চাচ্ছে প্রায় দুই লাখ টাকা। খামারিরা বলছেন গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায়, প্রভাব পড়েছে এবার কোরবানির পশুর দামে।
তবে বিক্রেতাদের দাবি একটি গরুর পেছনে অনেক টাকা খরচ হয়। যত্ন নিতে হয় অনেক বেশি। ফলে এ দামে বিক্রি করেও তেমন লাভবান হওয়া যায় না। তবে ঐতিহ্য ধরে রাখতে বাপ-দাদার এ ব্যবসা ধরে রেখেছেন অনেকেই।
শাহীন,আমির হামজা,খালেক মিয়া ও ইমন বেপারী সহ আরও বেশ কয়েকজন স্থানীয় ধবল গরুর খামারি বলেন, মাত্রা অতিরিক্ত গো খাদ্যের দাম বৃদ্ধি পাওয়া সহ শ্রমিক সংকটে দিন দিন কমে আসছে খামারির সংখ্যা এছাড়াও আর্থিক অনটনে পেশা বদল করেছেন অনেকেই তাই মিরকাদিমের গরু খামারিদের দাবি, সরকার যদি তাদের আর্থিক সহযোগিতা দিত, তাহলে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হওয়া গরু এ ব্যবসায় এগিয়ে নেওয়া যেত।

তারা জানান,এক সময় সাইজুদ্দিন হাজী, কালা মিয়া হাজী,মোফাজ্জ্বল হোসেন মিরকাদিমের গরু ব্যবসায়ী হিসেবে পুরনো ঢাকায় দীর্ঘকাল ধরে রাজত্ব করে গেছেন এখনও পুরনো ঢাকার রহমতগঞ্জ মাঠের গরুর হাটে মিরকাদিমের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। পুরনো ঢাকার ব্যবসায়ীদের প্রথম পছন্দ এসব গরু।
প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের তথ্য বলছে,ধবল গরু সহ মুন্সিগঞ্জের ছয়টি উপজেলায় এবার কোরবানির পশুর হাটে বিক্রির জন্য লাল ষাঁড় গরু সহ বিভিন্ন জাত প্রায় ৪৫ হাজার প্রস্তুত করেছেন খামারিরা।
জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা এম,এ জলিল বলেন, চলতি বছর মিরকাদিমে ১৬টি খামারে প্রায় ৪ শতাধিক ধবল গরু ঈদে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেছেন খামারিরা,তবে গো খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটে যেসব খামারিদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে এ বছর আমরা তাদের সার্বিক সহযোগিতা করার পাশাপাশি বিনামূল্যে পশুর চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছি।
একসময় ঘরে ঘরে সাদা গরু লালন-পালন হলেও এখন হাতেগোনা কয়েকটি পরিবার এই পেশাকে টিকিয়ে রেখেছে।
স্থানীয় খামারিদের দাবি, এই ২০০ বছরের ইতিহাসকে যদি টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণের কোনো বিকল্প নেই। জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে চিকিৎসার আশ্বাস দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা আরও বাড়ানোর দাবি তাদের।

তবুও প্রতিকূলতার মাঝেও মিরকাদিমের ধবল গরু আজও তার রাজকীয় উপস্থিতি ধরে রেখেছে, যার টানে ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে ঐতিহ্যের সন্ধানে ছুটে আসেন দূর-দূরান্তের মানুষ।
প্রতিনিধি/একেবি




