শনিবার, ৯ মে, ২০২৬, ঢাকা

এক আকাশ রোদ, মাটির বুকে নিঃশব্দ আর্তনাদ

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার
প্রকাশিত: ০৯ মে ২০২৬, ০২:৪০ পিএম

শেয়ার করুন:

এক আকাশ রোদ, মাটির বুকে নিঃশব্দ আর্তনাদ

মৌলভীবাজারের হাওরপাড়ে আজকের সকালটা যেন এক অদ্ভুত দ্বৈততার গল্প বলছে আকাশে রোদের কোমল ঝিলিক, আর মাটির বুকে জমে থাকা নিঃশব্দ আর্তনাদ।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, প্রকৃতি যেন একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি, মেঘের গর্জন আর ঝোড়ো হাওয়ার পর আজ নেই সেই তাণ্ডবের ছাপ। আকাশ পরিষ্কার, রোদের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। কিন্তু এই আলো কৃষকের মনকে পুরোপুরি আলোকিত করতে পারছে না। কারণ, এই সামান্য রোদই এখন তাদের কাছে শেষ আশ্রয়।


বিজ্ঞাপন


গত কয়েক দিনের অবিরাম বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি। সোনালি ধানের স্বপ্নগুলো ডুবে আছে পানির নিচে। মাঠের পর মাঠ এখন যেন এক বিষণ্ণ জলরাশি, যেখানে ফসলের চেয়ে বেশি ভাসছে কৃষকের হতাশা।

সদর উপজেলার আখাইলকুড়া ইউনিয়নের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রোদ উঠতেই কৃষকদের মধ্যে শুরু হয়েছে এক নীরব যুদ্ধ। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে তারা ছুটছেন ধান বাঁচানোর শেষ চেষ্টায়। কেউ আধপাকা ধান কেটে তুলছেন, কেউ নৌকায় করে সেগুলো সরিয়ে নিচ্ছেন উঁচু জমিতে। আবার কেউ ভেজা ধান মাড়াই করছেন শুধু এই আশায় যে, যতটুকু বাঁচানো যায়।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মৌলভীবাজারের সাতটি উপজেলায় ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত এবং ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রায় ২০ হাজার কৃষক। মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্যমতে, দুই দিন আগেও যে জমিতে পানি ছিল না, সেখানে এখন বুকসমান পানি। ৪০-৫০ আঁটি ধান আনতে নৌকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে ৫০০ টাকা, আর শ্রমিকের মজুরি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা। ফলে ধান বিক্রি করে উৎপাদন খরচও তোলা সম্ভব হচ্ছে না।


বিজ্ঞাপন


অন্তেহরি গ্রামের কৃষক মলয়কান্তি দাস বলেন, ‘এই কাউয়াদীঘি হাওরে আমার ১২ কিয়ার জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ২ কিয়ার কোনোমতে উদ্ধার করতে পেরেছি, এটাই এখন সম্বল। বাকিটা হারিয়ে এখন ধারদেনা করে চলতে হবে।’

৫ কিয়ার জমি ইজারা নিয়ে চাষ করা বর্গাচাষি রথিন্দ্র সূত্রধর জানান, পানির নিচ থেকে মাত্র চার শতক জমির ধান তুলতে পেরেছেন। ছয়জন শ্রমিক দিয়ে ধান তুলতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার টাকা। এর আগে এক কিয়ার জমিতে চাষাবাদেই খরচ হয়েছিল ১০ হাজার টাকার বেশি।

বিরইমাবাদ এলাকার কৃষক মন্তাজ মিয়া বলেন, ‘সারা বছরের খোরাকি পানির নিচে চলে গেছে। এখন কী করব, তা নিয়ে চিন্তায় আছি। ফসল হারানোর এই দুঃখ ভুলতে পারছি না। বুকসমান পানির তল থেকে ধান তুলেও আর লাভ নেই।’

বুড়িকোনা গ্রামের আলাল মিয়া বলেন, ‘২০ কিয়ার জমির ধান পানির নিচে। মাত্র ৪ কিয়ার তুলতে পেরেছি, তাও ভালো অবস্থায় নেই। এখন আর কেউ বুকসমান পানিতে নামতে চায় না। আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি।’

Moulove

মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘জেলায় এখন পর্যন্ত ৫ হাজার ২০০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত এবং ৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর জমির ধান পচে নষ্ট হয়েছে। কাউয়াদীঘি হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে সেচ কার্যক্রম চালু থাকলেও ভারী বর্ষণের কারণে দ্রুত পানি নামানো সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি আরও জানান, মাঠপর্যায়ে জরিপের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে।

প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর