হরি নদীর কূল জুড়ে শ্যামল সুবজে ঘেরা ছোট্ট গ্রাম। গ্রামটির ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে ছোট সাইনবোর্ডে লেখা ‘চারুকুঠি’ ভিতরে প্রবেশ করতেই এক তলা বিশিষ্ট ঘর। দরজার চৌকাঠ পেরোতেই চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে অসংখ্য ছবি। সিঁড়ির দেওয়াল, ছাদে ওঠার পথ, এমনকি টিনের চালার নিচেও সাজানো ক্যানভাসের সারি। পুরো বাড়ি জুড়ে যেন রঙ, রেখা আর কল্পনার মেলায় সাজানো জীবন্ত কর্মশালা। নড়াইল সদর উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামের এক সাধারণত বাড়ি এটি যার নাম ‘চারুকুঠি’।
তবে বাড়িটির ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায়, এটি সাধারণ বাড়ি নয়, যেন শিল্পীর এক জীবন্ত জগৎ। বাড়িটির প্রতিটি কোণেই পাওয়া যায় শিল্পের ছোঁয়া। দেয়ালে টাঙানো ছবির পাশাপাশি রয়েছে টেরাকোটার কাজ, ছোট ছোট ভাস্কর্য এবং গ্রামীণ জীবনের পুরোনো তৈজসপত্র। তার আঁকা প্রতিটি ছবিতে যেন ফুটে উঠেছে বিশ্ব বরণ্য চিত্র শিল্পী এসএম সুলতানের শিল্প হাতের ছাপ।
বিজ্ঞাপন
বাড়িটির মালিক ধর্মদাস মল্লিক, যিনি শিল্প মহলে ‘ডিডি মল্লিক’ নামে পরিচিত। তিনি জানান, তার আঁকা শতাধিক ছবি বাড়ির দেয়ালে টাঙানো থাকলে ও জায়গার অভাবে অন্তত এক হাজারের বেশি ছবি টাঙাতে পারিনি। অনেক ছবি বৃষ্টির ছিটায় নষ্ট হচ্ছে, কিছু পড়ে থেকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। রাখার জায়গার সংকটে বড় ছবি আঁকতেও পারছেন না তিনি।
ধর্মদাস মল্লিকের বাড়ি নড়াইল সদর উপজেলার শিমুলিয়া গ্রামে। তিনি কিংবদন্তি চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের শিষ্য। তার বাবার নাম সরোজ মল্লিক, মা সুমিত্রা মল্লিক। ঢাকায় দুই দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন চিত্রশিক্ষা, প্রদর্শনী ও পেশাগত কাজে। খুলনা আর্ট কলেজ থেকে শুরু করে চিটাগাং চারুকলা ইনস্টিটিউট, পরে নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, সবশেষ ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ থেকে এম.এফ.এ. (চারুকলায় স্নাতকোত্তর) ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। তার আঁকা ছবি প্রদর্শিত হয়েছে দেশ-বিদেশে।

সরেজমিনে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছাদের একচালায় দাঁড়িয়ে ছবি আঁকছেন ডি. ডি. মল্লিক। তার তুলিতে ফুটে উঠেছে গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য। চারপাশে শিশু-কিশোরেরা যার যার মতো করে ছবি আঁকছে। কেউ আঁকা শেষ করে দৌড়ে গিয়ে গুরুকে দেখাচ্ছে তাদের সৃষ্টি।
বিজ্ঞাপন
প্রতি শুক্রবার সকালে দূরদূরান্ত থেকে অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থী আসেন তার কাছে ছবি আঁকা শেখার জন্য। এক টাকাও ফি নেন না তিনি। বিনা মূল্যের এই শিল্পবিদ্যালয়ের নাম দিয়েছেন ‘চারুকুঠি শিল্পালয়’। ২০২০ সাল থেকে চলছে এই পাঠশালা।
ছবি আঁকার ফাঁকে কথা হয় হয় ধর্মদাস মল্লিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ঢাকায় থাকাকালীন আমার একটি পাঠশালা ছিল, যেখানে নামমাত্র বেতনে সবাই ছবি আঁকা শিখত। কিন্তু একসময় মনে হলো শহরের কংক্রিট জীবনে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম, গুরু সুলতানের মতো আমিও গ্রামে ফিরে শিশু-কিশোরদের বিনা পয়সায় শেখাব। সেই ভাবনা থেকেই চারুকুঠির যাত্রা শুরু।
গুরু সুলতানের কাছ থেকে যেভাবে ছবি আঁকা শিখেছিলেন ধর্মদাস, সেভাবেই শিশুদের শেখানোর চেষ্টা করেন তিনি। চারুকুঠি তার কাছে শুধু আঁকার জায়গা নয়, প্রকৃতি ও জীবনের পাঠশালা। তিনি বলেন, শিশুদের মাটির গন্ধ, সূর্যের তাপ, বৃষ্টির ছোঁয়া অনুভব করাতে হবে। তাই এখানে তারা শুধু ছবি আঁকা শেখে না, চাষও করে, ফসল ফলায়, মাছের পোনা ছাড়ে। প্রতি শনিবারে ‘এসো কাজ শিখি’ নামে বিশেষ সেশন হয় চারুকুঠিতে, যেখানে বাগান পরিচর্যা, জীববৈচিত্র্য বোঝা ও প্রকৃতিকে জানার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা।

বড় শিল্পী হবেন এমন কোনো স্বপ্ন নিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করেননি ধর্মদাস মল্লিক। শুরুতে তার আঁকা ছিল নিঃশব্দ প্রতিবাদের ভাষা। একবার এক প্রতিবেশী তার একটি কবুতর মেরে ফেলেছিলেন। সেই অন্যায় গভীর দাগ কেটেছিল কিশোর ধর্মদাসের মনে। ব্যথিত মনে তিনি বাড়ির মাটির দেয়ালে আঁকলেন মৃত কবুতরের ছবি, নিচে লিখলেন ‘জীব হত্যা মহাপাপ, নরকে গমন।’ সেখান থেকেই ছবি হয়ে ওঠে তার প্রতিরোধের হাতিয়ার। গ্রামের অন্যায় অবিচারের প্রতিবাদ জানাতেন রঙে ও রেখায়।
তবে তাতেই তৃপ্তি পাননি তিনি। শুধু প্রতীক নয়, মানুষের মুখও ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন ক্যানভাসে। স্থানীয় কয়েকজন শিল্পীর কাছে কিছুটা শেখেন, কিন্তু মন ভরেনি তার। ঠিক তখনই এক মামাতো ভাই জানালেন নড়াইলে নাকি এক ‘বৃদ্ধ মানুষ’ আছেন, যাঁর কাছে গেলে অনেক কিছু শেখা যাবে। সেই ‘বৃদ্ধ’ আর কেউ নন, বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস. এম. সুলতান।
ধর্মদাস স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, প্রথমবার গিয়ে গুরুর সঙ্গে দেখা হয়নি। বলা হয়েছিল পরদিন যেতে। দ্বিতীয়বার ১৪ কিলোমিটার হেঁটে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা হলো। তার আঁকা বিশাল মানবমূর্তি দেখে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল এমনটাই তো আমি আঁকতে চাই! সেদিন থেকেই শুরু হয় গুরুর কাছে আমার সাত বছরের শেখা। জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি সেটাই।
দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বড় হয়েছেন ধর্মদাস মল্লিক। সংসারের প্রতি বাবা ছিলেন উদাসীন; দরিদ্র সংসারটিকে আগলে রেখেছিলেন মা-ই। অভাবের দিনে বিল থেকে তুলে আনা ড্যাপ, শালুক আর আলু ফল এই ছিল তাদের নিত্য আহার। ছোটবেলা থেকেই নানা কাজ করেছেন ধর্মদাস। একসময় স্কুলের বেতন দিতে না পারায় পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। তখন এলাকার রায়বাবুদের বাড়িতে কাজ নেন। তার পড়ার আগ্রহ দেখে ছোট রায়বাবু নিজেই পরীক্ষার ফি দিয়ে দেন। পরে কাজ করে সেই টাকা শোধ করেন ধর্মদাস।
রায়বাবুদের বাড়ির পরিবেশ ছিল শিক্ষার অনুকূল। সেখানে যারা কাজ করতেন, তারাও পরীক্ষার সময় নিজেদের সঞ্চিত টাকা তুলে দিয়েছিলেন ধর্মদাসের হাতে যাতে ছেলেটা পরীক্ষায় বসতে পারে। দারিদ্র্যের টানাপোড়েন থামেনি তখনও। সুলতানের কাছে ছবি শিখতে তিনি প্রতিদিন ১৪ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতেন, আবার ফিরতেন। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন গুরুর বাড়িতেই থেকে।

ধর্মদাস বলেন, ম্যাট্রিক পাসের পর আর্ট কলেজে ভর্তি হতে গিয়ে দেখি, প্রচুর খরচের বিষয়। বাবা রাজি ছিলেন না। কিন্তু আমার জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করেন। তিনি তার আউশ ধানের জমি, গরু-ছাগল, এমনকি বাড়ির গাছপালাও বিক্রি করে আমাকে টাকা দিয়েছিলেন। আমার এক বৌদি ছিলেন। তিনি ডিম বিক্রি করে টাকা জমিয়ে দিতেন আমার হাতে। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী সবাই যে যেভাবে পেরেছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। এ কথা বলতে বলতে চোখ ভিজে আসে ধর্মদাসের। বাবার সেই ত্যাগ তাকে আজ যেখানে এনে দাঁড় করিয়েছে, তা দেখে যেতে পারেননি বাবা।
খুলনা আর্ট কলেজে পড়াকালীন পড়াশোনা চালাতে নিজের আঁকা ছবি বিক্রি শুরু করেন ধর্মদাস। সুলতানের মতো তিনিও নিজ হাতে তৈরি করতেন ক্যানভাস, রং ও তুলি। আর্থিক কারণে এগুলো বিক্রিও করতেন। ধীরে ধীরে বাড়ে তার পরিচিতি। তার ছবি প্রদর্শিত হয় ঢাকার গ্যালারি, শেরাটন ও সোনারগাঁও হোটেলে, এমনকি কলকাতায়ও। অনেক ছবি বিক্রি হয়েছে বিদেশে।
ধর্মদাস বলেন, ৫০ টাকা থেকে শুরু করেছিলাম, আড়াই লাখ টাকায়ও ছবি বিক্রি করেছি। শহরে থাকলে হয়তো বিভিন্ন জায়গায় ছবি প্রদর্শন করতে পারতাম, বেশি বিক্রি হতো; কিন্তু আমি চেয়েছি মাটির কাছাকাছি থাকতে, শিল্পকে মানুষের মধ্যো ছড়িয়ে দিতে। আমি একদিন থাকব না; কিন্তু আমার শিল্প যেন বেঁচে থাকে সেই চেষ্টাই করছি।
ধর্মদাসের স্বপ্ন আর্থিক সহযোগিতা পেলে শিমুলিয়ায় তার অসমাপ্ত বাড়িটি একদিন সমাপ্ত হবে। বাড়িজুড়ে থাকবে তার আঁকা ছবি, যা মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখবে। একটি কক্ষে ঠাঁই পাবে হারিয়ে যাওয়া গ্রামীণ পেশা, সরঞ্জাম ও গল্প, যা দেখে নতুন প্রজন্ম চিনবে নিজের শিকড়।

এই স্বপ্নপূরণে এগিয়ে এসেছেন তার শুভাকাঙ্ক্ষী জাতিসংঘের দুই কর্মকর্তা। তারা প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে শিমুলিয়া গ্রামে দুই খণ্ড জমি কিনে দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে সেই জমিতে চাষাবাদ করেন ধর্মদাস মল্লিক। তার পাঠশালা ঘুরে শিল্পপ্রেমী এক বিচারপতি দিয়েছিলেন লাখ টাকা। মাঝেমধ্যে অন্য শুভাকাঙ্ক্ষীরাও সহযোগিতা করেন। জমি থেকে আসা ফসলের টাকা ও এসব সহায়তায় চলছে তার শিল্পবিদ্যালয় ‘চারুকুঠি শিল্পালয়’।
ধর্মদাস বলেন, ঢাকায় যেসব জায়গায় ছবি প্রদর্শন করতাম, সেখানে দিনে দু-তিনটি ছবিও বিক্রি হতো। লাখ টাকা আয় ছিল। গ্রামে ফিরে আসার পর আর তেমনটা হয় না। তবে শুভাকাঙ্ক্ষীদের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে কিছু বিক্রি হয়। ছবি বিক্রি আর চাষবাস করে যা আয় হয়, তা দিয়েই যতটুকু সম্ভব করছি, আমি কখনোই টাকার পেছনে ছুটিনি। যদি টাকার পেছনে ছুটতাম, আজ ঢাকায় গাড়ি-বাড়ি থাকত, চাকচিক্যের জীবন কাটাতাম; কিন্তু আমি সব সময় স্বপ্নকেই প্রাধান্য দিয়েছি। তাই শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে এসেছি।
গুরু এসএম সুলতানের স্মৃতিচারণ করে ধর্মদাস বলেন, সুলতান যখন বেঁচে ছিলেন তখন তার কদর ছিল না। মৃত্যুর পর তার দাম বেড়েছে। কোনো এক দিন হয়ত তার স্বপ্ন পূরণ হবে সেই আশা নিয়েই নিজ গ্রামে কাজ করে যাচ্ছেন এই শিল্পী।
প্রতিনিধি/টিবি




