মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

পরিচয় মিললেও বেওয়ারিশ হিসেবেই খোকন মিয়ার দাফন

জেলা প্রতিনিধি, ব্রাহ্মণবাড়িয়া 
প্রকাশিত: ০৫ মে ২০২৬, ১০:০০ পিএম

শেয়ার করুন:

পরিচয় মিললেও বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন হল খোকন মিয়ার

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মর্গে চার দিন পড়ে থাকা প্রতিবন্ধী খোকন মিয়ার মরদেহ নিতে আসবেন বলে আশ্বাস দিয়েও শেষ পর্যন্ত আসেননি তার ছোট ছেলে রানা। পরে মানবিক উদ্যোগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের ব্যবস্থাপনায় বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে তার দাফন সম্পন্ন করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় খোকন মিয়ার দাফন সম্পন্ন হয়। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরও পরিবারের স্ত্রী-সন্তান মরদেহ গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করায় মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়।


বিজ্ঞাপন


এর আগে, সোমবার (৪ মে) দুপুরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর থেকে খোকন মিয়ার ছেলে রানার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আর অপেক্ষার প্রয়োজন নেই; তার বাবার মরদেহ দাফন করে ফেলতে। যদিও তার আগের দিন রোববার অনেক অনুরোধ করে তাকে অন্তত শেষবারের মতো এসে মরদেহ গ্রহণ করে নিজ এলাকায় দাফনের ব্যবস্থা করার আহ্বান জানানো হয়েছিল। এ জন্য অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া থেকে শুরু করে কাফন-দাফনের সব ব্যয় বহনের আশ্বাসও দিয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ মার্চ গুরুতর সংক্রমণজনিত রোগ সেলুলাইটিস নিয়ে পুলিশ খোকন মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করে। দীর্ঘ ৩৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর গত বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে তার মৃত্যু হয়। তার বয়স আনুমানিক ৫০ বছর। মৃত্যুর পর সদর মডেল থানার পক্ষ থেকে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানায় বেতার বার্তা পাঠানো হয়। পরে দেবিদ্বার থানা পুলিশ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানায়, গত ১০-১২ বছর ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই এবং তারা মরদেহ গ্রহণে অনাগ্রহী। আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও মানবিকতার জায়গা থেকে আরও কিছু সময় অপেক্ষা করা হয়। আশা ছিল, হয়তো শেষ মুহূর্তে পরিবারের কেউ এগিয়ে আসবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউ না আসায় মঙ্গলবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের উদ্যোগে তাকে বেওয়ারিশ মরদেহ হিসেবে দাফন করা হয়।

জানা যায়, খোকন মিয়ার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের করুইন গ্রামে। তার পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তিনি শারিরীক প্রতিবন্ধী ছিলেন৷ স্ত্রী ও দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময় তাকে কাটাতে হয়েছে চরম অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে।

হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগের ইনচার্জ তাহমিনা আক্তারসহ চিকিৎসক ও নার্সরা তাকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরও সহযোগিতা করে।


বিজ্ঞাপন


মৃত্যুর আগে খোকন মিয়া অস্পষ্ট কণ্ঠে নিজের নাম, বাবার নাম এবং কুমিল্লার একটি ঠিকানার কথা জানান। সেই সূত্র ধরে জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু যোগাযোগ করা হলে তার স্ত্রী নিলুফা আক্তার এবং দুই ছেলে রাজু ও রানা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি মৃত্যুর আগেই মরদেহ গ্রহণ করবেন না বলেও জানিয়ে দেন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছিল। আইনগত সুযোগ দেওয়ার পরও তারা মরদেহ নিতে রাজি হয়নি। পরে সব প্রক্রিয়া শেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে খোকন মিয়ার সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। তাই তারা মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জি. মো. আজহার উদ্দিন বলেন, মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই আমরা খোকন মিয়ার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছিলাম। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও যথাযথ যত্নের অভাবে তিনি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে মানবিক দিক বিবেচনায় আমরা তার দাফনের ব্যবস্থা করি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এম এম রকীব উর রাজা বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক। মৃত্যুর পরও পরিবারের কেউ এগিয়ে না আসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের মাধ্যমে মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এমন মানবিক উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়।

প্রতিনিধি/ এজে

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর