মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

রাস্তার দু’ধারে থোকায় থোকায় ঝুলছে কাজুবাদাম, বদলাচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি

সুফল চাকমা, বান্দরবান
প্রকাশিত: ০৫ মে ২০২৬, ১২:৩৬ পিএম

শেয়ার করুন:

রাস্তার দু’ধারে থোকায় থোকায় ঝুলছে কাজুবাদাম, বদলাচ্ছে পাহাড়ের অর্থনীতি
বান্দরবানের থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নে রাস্তার দুধারে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা কাজুবাদাম।

বান্দরবানের সবুজ পাহাড়ের উঁচু নিচু সর্পিল সড়কের দুইধারে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল-হলুদ পাকা কাজুবাদাম। একসময় পাহাড়ের বাগানে পড়ে থেকে পচে যেত এই ফল। তবে সময়ের পরিবর্তনে সেই কাজুবাদাম এখন পাহাড়ের মানুষের অন্যতম লাভজনক অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়ভাবে কাজুবাদামকে ‘ক্যচনাট’ বা 'থাম নামে' বলা হয়। বাংলায় এটি কাজুবাদাম এবং ইংরেজিতে Cashew Nut. এর বৈজ্ঞানিক নাম Anacardium occidentale. আগে পাহাড়ের অধিকাংশ মানুষ জীবিকার জন্য সম্পূর্ণ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু জুমচাষে আগের মতো ফলন না হওয়া, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাদযোগ্য জমি সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় এখন স্থায়ী ফলদ বাগান তৈরিতে ঝুঁকছেন পাহাড়িরা। বিশেষ করে কাজুবাদাম চাষ করে অনেকেই অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।


বিজ্ঞাপন


3df9a464-7011-48f7-92ee-1e84e72f796b

এপ্রিলের শেষ থেকে মে মাসের শুরুতে পাহাড়ি এলাকায় গেলে দেখা যায়, কেউ কাজুবাদাম ছিঁড়ছে, কেউ কুড়াচ্ছে, আবার কেউ শুকাচ্ছে।

বর্তমানে পাহাড়জুড়ে কাজুবাদাম চাষিদের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মতো। বর্তমানে প্রতিমণ কাজুবাদাম সাড়ে পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ফলে পাহাড়ে এখন অনেক পরিবারের ছোট-বড় কাজু বাগান রয়েছে। কারও কয়েকশ, আবার কারও ২০-৩০ একরজুড়ে হাজার হাজার গাছ।

3208e681-52b4-4cf9-be3d-1e55f19578f7


বিজ্ঞাপন


অতিসম্প্রতি রুমা ও থানচি উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার ধারে ও বাগানে থোকায় থোকায় ঝুলছে পাকা কাজু বাদামের ফল।

f82d4ded-df63-4fa3-aa5e-e9e84eb60491

থানচি উপজেলার বলিপাড়া ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দিনতে পাড়ার কারবারি ও কাজুবাদাম চাষি রেইনিং ম্রো (৬৩) ঢাকা মেইলকে জানান, তার পরিবারের সাত সদস্য নিয়ে আগে জুমচাষ করতেন। কিন্তু জুমে আগের মতো ফলন না হওয়ায় এখন স্থায়ীভাবে কাজুবাদাম চাষ করছেন। তিনি বলেন, আমার ২৫ একর জমিজুড়ে প্রায় ২ হাজার কাজুবাদাম গাছ আছে। গত বছর ফলন তেমন ভালো হয়নি, তারপরও ২৭ মণ কাজু বাদাম বিক্রি করে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা পেয়েছি। এ বছর ভালো ফলন হয়েছে, তাই গত বছরের দ্বিগুণ- ৫৪ মণ ফলনের আশা করছি, এতে প্রায় ২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা আয় হতে পারে বলে জানান তিনি।

3df9a464-7011-48f7-92ee-1e84e72f796b

একই ইউনিয়নের থাংনাং পাড়ার লংছাই খুমী (৪৫) বলেন, তার ১৫ একরজুড়ে কাজুবাদাম বাগান আছে, গত বছর ৫০ মণ কাজুবাদাম প্রতিমণ ৬ হাজার ৬০০ টাকা করে বিক্রি করে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। চলতি বছরও সেরকম আশা করছেন বলে জানান তিনি।

থানচি উপজেলার কমলা বাগান পাড়ার বাজেরুং ত্রিপুরা (৫০) জানান, তিন বছর আগে বিভিন্ন ফলদ বাগানের পাশাপাশি কাজুবাদাম চাষ শুরু করেছেন। গত বছর ৩০০ গাছ থেকে ২০ মণ কাজুবাদাম বিক্রি করে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা আয় করেন। এ বছর ৪০ মণ ফলনের আশা করছেন বলে জানান তিনি।

268d5b9c-7bbe-41e3-976a-c394a642cbfa

তিনি আরও বলেন, আগে সম্পূর্ণ জুমচাষের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। এখন জুমে ফলন কম হওয়ায় বিভিন্ন ফলদ বাগান ও কাজুবাদাম চাষ করে লাভবান হচ্ছেন।

বান্দরবান উপশহর বালাঘাটায় অবস্থিত কাজুবাদাম প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান কিষাণ ঘরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তারেকুল ইসলাম ঢাকা মেইলকে জানান, গত বছর তারা মণপ্রতি কাজুবাদাম সাড়ে সাত হাজার থেকে আট হাজার টাকা দরে ক্রয় করেছিলেন। চলতি বছর এখনও ক্রয় কার্যক্রম শুরু হয়নি, তবে শিগগিরই শুরু হবে। তিনি বলেন, ২০২০ সাল থেকে কিষাণ ঘর চালু করেছেন। এখানে ৭৪ জন মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক থেকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিষ্ঠান হিসেবে যেমন ঋণ পাচ্ছে না, তেমনি তাদের ১২০০ কৃষকও কৃষিঋণ থেকে বঞ্চিত। তার ভাষ্য, কৃষিঋণের অভাবে অনেক কৃষক দাদন ব্যবসায়ীদের কাছে আগাম কম দামে কাজুবাদাম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। তাই ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে কাজুবাদাম চাষিদের জন্য কৃষিঋণের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানান তিনি।

0585dbbb-50d0-472b-b7b1-0cbfe8c3a724

বান্দরবান কৃষিসম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ২ হাজার ৫৫৬ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম আবাদ হয়ে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৪৬০ মেট্রিক টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৬১৯ হেক্টরে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৬০৬ মেট্রিক টন। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৭১১ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ১ হাজার ৭৮১ মেট্রিক টন কাজুবাদাম।

4afcb4f6-7d02-4500-8b6d-ee71ca88d4e9

বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ আবু নঈম মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন ঢাকা মেইলকে বলেন, বান্দরবানে কফি ও কাজুবাদাম অত্যন্ত লাভজনক অর্থকরী ফসল। কৃষি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি প্রদর্শনী বাগানও করা হচ্ছে। ফলে দিন দিন কাজুবাদামের আবাদ বাড়ছে। তিনি আরও বলেন, কাজুবাদাম গাছ রোপণের ৩-৪ বছর পর ফলন আসে। তাই এটি সময়সাপেক্ষ হলেও লাভজনক হওয়ায় কৃষকরা আগ্রহী হচ্ছেন। ভবিষ্যতে আবাদ আরও বাড়বে এবং কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবেন বলে জানান এই কৃষিবিদ।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর