মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ঢাকা

নৃশংসতার ক্ষত বয়ে বেড়ানো ঘোড়া, মানবতায় মিলল আশ্রয়

জেলা প্রতিনিধি, শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ০৫ মে ২০২৬, ০৬:০৩ এএম

শেয়ার করুন:

নৃশংসতার ক্ষত বয়ে বেড়ানো ঘোড়া, মানবতায় মিলল আশ্রয়

শরীয়তপুর সদর উপজেলায় বেশ কিছুদিন ধরে কয়েকটি বেওয়ারিশ ঘোড়া ঘুরে বেড়াচ্ছিল। স্থানীয়রা কেউ খাবার দিত, কেউ বা আদর করত—নিরীহ প্রাণীগুলোও যেন মানুষের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছিল। কিন্তু হঠাৎই সেই চেনা দৃশ্য বদলে যায়। কয়েকদিনের ব্যবধানে ঘোড়াগুলোকে দেখা যায় রক্তাক্ত এবং শরীরে গভীর ক্ষত নিয়ে অসহায় অবস্থায়।

উপজেলার মনোহর বাজার মোড় এলাকায় গত ৩-৪ দিন ধরে দুটি ঘোড়াকে গুরুতর আহত অবস্থায় দেখা যায়। তাদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন; কোথাও চামড়া কেটে মাংস পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতস্থান থেকে অনবরত রক্ত ঝরছিল এবং ব্যথায় চোখ দিয়ে জল পড়ছিল—বোবা প্রাণী দুটি যেন নীরবে তাদের যন্ত্রণার কথা জানাচ্ছিল।


বিজ্ঞাপন


সোমবার রাতে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এর আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহত ঘোড়াগুলোর ছবি ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। বিষয়টি নজরে আসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছাআ) শিক্ষার্থীদের।

শিক্ষার্থীরা জানান, ঘোড়াগুলোর চিকিৎসার জন্য তারা সরকারি পশু হাসপাতালে যোগাযোগ করেছিলেন, তবে সেখান থেকে প্রত্যাশিত সাড়া মেলেনি। অভিযোগ রয়েছে যে, হাসপাতালের একজন কর্মী ঘটনাস্থলে গিয়ে নামমাত্র ওষুধ প্রয়োগ করে ফিরে যান এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাননি।

পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা নিজস্ব উদ্যোগে ডামুড্যা উপজেলা থেকে বেসরকারি ভেটেরিনারি চিকিৎসক ডা. সবুজ খানকে নিয়ে আসেন। স্থানীয় যুবকদের সহায়তায় আহত ঘোড়াগুলোর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করা হয় এবং একাধিক স্থানে সেলাই দেওয়া হয়। বর্তমানে ঘোড়াগুলোর নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যা চলছে।

চিকিৎসক ডা. সবুজ খান বলেন, ‘ধারালো কিছুর আঘাতে ঘোড়াগুলোর শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। কিছু জায়গায় মাংস কেটে গুরুতর সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনীয় সেলাই ও ওষুধ দেওয়া হয়েছে; আশা করা যাচ্ছে নিয়মিত চিকিৎসায় তারা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে।’


বিজ্ঞাপন


স্থানীয় ব্যবসায়ী আশফাক মিয়া বলেন, ‘ঘোড়াগুলো কয়েকদিন ধরে আমার দোকানের সামনে ঘুরছিল। তাদের করুণ অবস্থা দেখে খুব কষ্ট লেগেছে। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে প্রাণী দুটিকে বাঁচানো কঠিন হতো।’

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেলা শাখার সাবেক আহ্বায়ক ইমরান আল নাজির বলেন, ‘নিরীহ প্রাণীর ওপর এমন হামলা অত্যন্ত অমানবিক। পৌর এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে ফুটেজ যাচাই করলেই দোষীদের শনাক্ত করা সম্ভব। আমরা চাই অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হোক।’

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু বকর সিদ্দিক জানান, ঘোড়াগুলোর নির্দিষ্ট কোনো মালিক না থাকায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে তাদের পক্ষ থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও চিকিৎসার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, ‘প্রাণীর ওপর এ ধরনের নিষ্ঠুরতা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে আমরা অবশ্যই দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

নির্মমতার শিকার এই প্রাণীগুলোর পাশে শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের দাঁড়ানোর এই মানবিক উদ্যোগ সর্বমহলে প্রশংসিত হচ্ছে। তবে প্রশ্ন থেকেই যায় কারা এই নিষ্ঠুরতার হোতা, আর কবেই বা তাদের বিচারের মুখোমুখি করা হবে?

প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর