রোববার, ৩ মে, ২০২৬, ঢাকা

নতুন সক্ষমতা দেখাল চট্টগ্রাম বন্দর: ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটি ভিড়ল জেটিতে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ০৩ মে ২০২৬, ০৯:১৪ পিএম

শেয়ার করুন:

নতুন সক্ষমতা দেখাল চট্টগ্রাম বন্দর: ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটি ভিড়ল জেটিতে
সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ। ছবি: ঢাকা মেইল

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে কনটেইনারবাহী দুটি জাহাজের সংঘর্ষের ঘটনায় যখন আমদানিকারকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে, ঠিক তখনই ভেতরে ভেতরে বড় প্রস্তুতি নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটি নিরাপদে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) জেটিতে ভিড়ানো হয়। এমন সক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দরের জন্য একেবারেই নতুন অভিজ্ঞতা।

আমদানিকারকদের ভাষ্য, বন্দরের এমন সক্ষমতা আছে, তা তাঁরা কল্পনাও করেননি। রোববার দুপুর আড়াইটার দিকে খবর ছড়িয়ে পড়ে, বহির্নোঙরে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ দুটি এনসিটি জেটিতে পৌঁছেছে। এতে জাহাজ দুটির কনটেইনারভর্তি পণ্য খালাস নিয়ে অনিশ্চয়তা কেটে যায়।


বিজ্ঞাপন


ফোর জুয়েল ডিস্ট্রিবিউটর কোম্পানি লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আমিন শরীফ ও শাহজাহান শরীফ বলেন, বন্দরের এমন সক্ষমতার কথা তাঁদের জানা ছিল না। এই সক্ষমতা চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাবে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে বড় ভূমিকা রাখবে।

রোববার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম বলেন, সিঙ্গাপুর থেকে আমদানিপণ্য নিয়ে শুক্রবার সকালে বন্দরে ভিড়ার কথা ছিল জাহাজ দুটির। বন্দরে পৌঁছানোর আগেই মুখোমুখি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে দুটি জাহাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

জাহাজ দুটি হলো বিদেশি জাহাজ মায়ের্স্ক চট্টগ্রাম এবং দেশীয় জাহাজ এইচআর তুরাগ। দুর্ঘটনার পর থেকেই জাহাজ দুটি বহির্নোঙরে অবস্থান করছিল। শুক্রবার বিকেলে জাহাজ দুটি জেটিতে আনার জন্য বহির্নোঙরে যান বন্দর পাইলট ক্যাপ্টেন মো. আতাউল হাকিম সিদ্দিকী ও ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ শামসুদ্দীন। তবে কাছাকাছি গিয়ে জাহাজের ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখে তাঁরা সেদিন আর জাহাজ না আনার সিদ্ধান্ত নেন।

পরে ক্যাপ্টেন শামসুদ্দীন বলেন, জাহাজের মূল কাঠামোয় ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। সংঘর্ষে জাহাজ দুটির নিচের অংশে আঘাত লাগে। পানির নিচে কোনো ফাটল বা গুরুতর ক্ষতি হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব ছিল না।


বিজ্ঞাপন


জাহাজ দুটি বহির্নোঙরে আটকে থাকায় আমদানিকারকদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে থাকে। কবে নাগাদ জাহাজ দুটি নিরাপদে বন্দরে পৌঁছাবে, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। পণ্য খালাস বিলম্বিত হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা থেকে জাহাজ দুটি জেটিতে ভিড়ানোর উদ্যোগ নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বন্দর সূত্র জানায়, রোববার সকাল ১১টায় চারজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে একটি দল বহির্নোঙরের উদ্দেশে রওনা দেয়। সেখানে টাগবোট ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে মায়ের্স্ক চট্টগ্রাম ও এইচআর তুরাগ এনসিটির উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।

আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন চৌধুরীর মালিকানাধীন কর্ণফুলী গ্রুপের জাহাজ এইচআর তুরাগ পরিচালনা করেন ক্যাপ্টেন আবু সাইদ মোহাম্মদ কামরুল আলম ও মোহাম্মদ তানভীর রহমান। অন্যদিকে মায়ের্স্ক চট্টগ্রাম পরিচালনা করেন বন্দরের সহকারী হারবার মাস্টার ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ আতাউল হাকিম সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, ঝুঁকি এড়াতে বন্দরের নৌ বিভাগ বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। প্রতিটি জাহাজে দুজন করে পাইলট রাখা হয়। দুপুর ১টা ২৫ মিনিটে জাহাজ দুটি নিরাপদে জেটিতে ভেড়ে। বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সাগরের মধ্যেও দেশের আমদানিকারকদের স্বার্থে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

ক্যাপ্টেন আবু সাইদ মোহাম্মদ কামরুল আলম বলেন, সকাল ১১টা ৬ মিনিটে বহির্নোঙর থেকে যাত্রা শুরু করে ১২টা ৫০ মিনিটে তাঁরা নিরাপদে জেটিতে পৌঁছান। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ধীরগতিতে জাহাজ চালাতে হয়েছে।

মায়ের্স্ক চট্টগ্রামে ১ হাজার ৮৭৮টি কনটেইনারে আমদানি পণ্য রয়েছে। এইচআর তুরাগে রয়েছে আরও এক হাজার কনটেইনার। দুটি জাহাজই আমদানি পণ্য খালাস করে জেটি ছাড়বে। তবে রপ্তানি কনটেইনার বোঝাই করবে না। কারণ, এখনো সমুদ্রে চলাচলের অনুমতি মেলেনি।

জাহাজ পরিচালনাকারীরা জানান, জাহাজ দুটি ডকইয়ার্ডে নিয়ে মেরামত করা হবে। তদন্ত কমিটির অনুমোদন, ক্ষয়ক্ষতির নিরূপণ এবং সমুদ্রে চলাচলের অনুমতি পাওয়ার পরই রপ্তানি কনটেইনার বোঝাই করা হবে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, জাহাজ দুটি জেটিতে আনার আগে রোববার সকাল ১১টা থেকে মোহনা থেকে এনসিটি পর্যন্ত নৌপথে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতিটি জাহাজকে তিনটি করে টাগবোট পাহারা দেয়। পাশাপাশি অতিরিক্ত টাগবোট স্ট্যান্ডবাই রাখা হয়।

ship

এ কারণে রোববার সকালে বন্দরের নির্ধারিত সূচির জাহাজগুলোর আগেভাগেই বার্থিং শেষ করা হয়। একই সময়ে সাধারণ জাহাজ চলাচলও সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। বন্দরের ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (ভিটিএমএস) থেকে ক্যামেরার মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম তদারকি করা হয়।

এ ছাড়া নৌ বিভাগ, বার্থ অপারেটর ও শিপিং লাইনের প্রায় ৪০ জন অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ করা হয়। অতীতে চট্টগ্রাম বন্দরে এভাবে একসঙ্গে দুটি ক্ষতিগ্রস্ত পণ্যবাহী জাহাজ ভিড়ানোর নজির নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

চট্টগ্রাম বন্দরের উপসংরক্ষক ক্যাপ্টেন জহিরুল ইসলাম বলেন, দুটি জাহাজে থাকা বিপুলসংখ্যক আমদানি কনটেইনার শুক্রবার থেকে আটকে ছিল। এতে আমদানিকারকদের উদ্বেগ বাড়ছিল। দেশের অর্থনৈতিক ক্ষতির বিষয় বিবেচনায় বিশেষ ব্যবস্থায় জাহাজ দুটি জেটিতে আনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

গত শুক্রবার সকালে বহির্নোঙর থেকে বন্দরের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার আগে জাহাজ দুটি সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর রোববার সকাল পর্যন্ত সেগুলো বহির্নোঙরেই ছিল। জাহাজ দুটিতে প্রায় ২ হাজার ৮০০ টিইইউএস আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার আটকে পড়ে।

এদিকে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে এখনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করা যায়নি বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির প্রিন্সিপাল অফিসার শেখ জালাল উদ্দিন গাজী।

প্রতিনিধি/এআর

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর