ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা সদর হাসপাতালে টানা ৩৮ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর চরম অবহেলা, অসহায়ত্ব ও নিঃসঙ্গতার মধ্যে মৃত্যু হয়েছে খোকন মিয়া (প্রায় ৫০) নামে এক ব্যক্তির। মৃত্যুর পরও ভাগ্যে জোটেনি আপনজনের শেষ বিদায়— স্ত্রী ও সন্তানরা তার মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
শুক্রবার (১ মে) সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলামের নির্দেশে থানার এসআই মো. মনির হোসেন খোকন মিয়ার বিষয়ে কুমিল্লার দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামানের কাছে বেতার বার্তা পাঠান। এর প্রেক্ষিতে দেবিদ্বার থানার এসআই সাগর বড়ুয়া খোকন মিয়ার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। পরিবারের সদস্যরা স্পষ্টভাবে জানান, খোকন মিয়ার লাশ গ্রহণের ব্যাপারে তাদের কোনো ইচ্ছা বা আগ্রহ নেই।
বিজ্ঞাপন
এর আগে বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) রাত ১০টার দিকে হাসপাতালের অর্থোপেডিক্স বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বর্তমানে তার মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গুরুতর সংক্রমণ (সেলুলাইটিস) নিয়ে গত ২৪ মার্চ সকালে পুলিশ খোকন মিয়াকে হাসপাতালে ভর্তি করে। প্রথমে সার্জারি বিভাগে চিকিৎসা চললেও অবস্থার অবনতি হলে ২ এপ্রিল তাকে অর্থোপেডিক্স বিভাগে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ ৩৮ দিন ধরে স্বেচ্ছাসেবী ও মানবিক সংগঠন ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’-এর তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা ও দেখভাল চলতে থাকে।
তবে এ সময়ের মধ্যে পরিবারের কেউ একবারের জন্যও তাকে দেখতে আসেননি। পরিচয় নিশ্চিতের জন্য তার কাছে থাকা জাতীয় পরিচয়পত্র ও প্রতিবন্ধী ভাতা কার্ডের মাধ্যমে কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ঠিকানা পাওয়া যায়। এরপর পুলিশ পরিবারকে খুঁজে বের করে যোগাযোগ করলেও তারা চিকিৎসার দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানান। এমনকি মৃত্যুর আগেই জানিয়ে দেন, তার মরদেহও গ্রহণ করবেন না।
খোকন মিয়ার শ্বশুরবাড়ি কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার করুইন গ্রামে এবং পৈতৃক বাড়ি লক্ষ্মীপুরে। তার বাবা মৃত বশির উদ্দিন ও মা মৃত মধুবালা বিবি। স্ত্রী নিলুফা আক্তার ও দুই ছেলে থাকা সত্ত্বেও জীবনের শেষ সময় তিনি কাটিয়েছেন সম্পূর্ণ একাকিত্বে।
বিজ্ঞাপন
পরিবারের দাবি, খোকন মিয়া দীর্ঘদিন ধরে তাদের সঙ্গে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ছিলেন এবং মাদকাসক্ত ছিলেন। তবে স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন চিকিৎসা ও পারিবারিক সহায়তার অভাবে তার শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
চিকিৎসকদের মতে, খোকন মিয়া মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং সাম্প্রতিক এক দুর্ঘটনায় তার বাম পায়ে গুরুতর আঘাত পান। উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার প্রয়োজন হলেও পরিবারের সহযোগিতা না থাকায় তা সম্ভব হয়নি।
মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘর’ তার চিকিৎসা ও দেখভাল করে আসছিল। মৃত্যুর আগে সংস্থাটির উদ্যোগে তাকে গোসল করানো, পরিষ্কার কাপড় পরানোসহ শেষ যত্ন নেওয়া হয়।
এ ব্যাপারে দেবিদ্বার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘খোকন মিয়ার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা তার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু তারা দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকার কথা উল্লেখ করে চিকিৎসা বা মরদেহ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানায়।'
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘মৃত্যুর পর আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আমরা সংশ্লিষ্ট থানার মাধ্যমে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। যেহেতু পরিবার মরদেহ নিতে রাজি হয়নি, তাই প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা শেষে দাফনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাতিঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. আজহার উদ্দিন বলেন, ‘খোকন মিয়া যখন হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তার পাশে কেউ ছিল না। আমরা মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে তার চিকিৎসা, খাবার ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করেছি। মৃত্যুর পরও আমরা তাকে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের উদ্যোগ নিয়েছি। সমাজে এমন ঘটনা সত্যিই কষ্টদায়ক।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রকিব উর রাজা বলেন, ‘এটি অত্যন্ত দুঃখজনক একটি ঘটনা। পরিবার থাকা সত্ত্বেও কেউ দায়িত্ব নেয়নি। আমরা আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে মরদেহ দাফনের ব্যবস্থা করছি। পাশাপাশি সমাজে পারিবারিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত হওয়া জরুরি।’
প্রতিনিধি/এমএইচআর




