বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

১২ দিনের নবজাতক রেখে বাবার বিদায়, পাশে চিরনিদ্রায় রাজকন্যা

জেলা প্রতিনিধি, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪১ পিএম

শেয়ার করুন:

১২ দিনের নবজাতক রেখে বাবার বিদায়, পাশে চিরনিদ্রায় রাজকন্যা

মাত্র ১২ দিন আগে ঘরে এসেছিল নতুন অতিথি। নবজাতক কন্যাকে ঘিরে স্বপ্নে ভাসছিল পুরো পরিবার। কিন্তু এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় মুহূর্তেই থেমে গেল সব স্বপ্ন। নবজাতককে রেখে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন বাবা। আর বাবার পাশেই চিরনিদ্রায় শায়িত হলো তার আদরের রাজকন্যা।

গতকাল মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী সড়কের বাঁশেরতল এলাকায় ট্রাক ও মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন শামীম হোসেন (২৮) ও তার সাত বছর বয়সী মেয়ে সাদিয়া আক্তার। পরদিন চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে প্রাণ হারান পাঁচজন।


বিজ্ঞাপন


নিহতরা হলেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের উত্তর তিলাই গ্রামের শামীম হোসেন ও তার মেয়ে সাদিয়া আক্তার, শামীমের বড় ভাই বাবু মিয়ার স্ত্রী তামান্না (২৭), নুরনবী মিয়া (২৮) এবং মাইক্রোবাস চালক লিমন (২৭)।

দুর্ঘটনার পরদিন নাগেশ্বরী থানা প্রাঙ্গণে লাশ নিতে এসে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন স্বজনরা। সাদিয়ার চাচা মুকুল মাহমুদের সঙ্গে কথা হয়। বললেন, ‘মাত্র ১২ দিন আগে শামীমের আরেকটি মেয়ে জন্ম নিয়েছে। কিছুদিন আগে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে কোমর থেকে পা পর্যন্ত অবশ হয়ে যায় তার। চিকিৎসার জন্যই রংপুরে নেওয়া হয়েছিল। ফেরার পথেই সব শেষ হয়ে গেল।’

তিনি আরও জানান, ঘটনাস্থলেই মারা যান শামীম ও তার মেয়ে সাদিয়া। পরে তাদের পাশাপাশি পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। তবে বাবার শেষ বিদায়ে কোলে থাকা ১২ দিনের নবজাতকটি আর সঙ্গী হতে পারেনি। সে রয়ে গেছে মায়ের বুকের কাছে, কান্নায় ভেঙে পড়া এক সংসারের শেষ ভরসা হয়ে।

স্বামী ও বড় মেয়েকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ জান্নাতি বেগম। চোখে জল, কিন্তু মুখে কোনো ভাষা নেই। যেন এক রাতেই তার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে গেছে।


বিজ্ঞাপন


শামীমের স্বজন মোমিনুর রহমান জানান, মাইক্রোবাসে শামীম, তার বড় ভাইয়ের পরিবার, আত্মীয়স্বজনসহ কয়েকজন ছিলেন। তারা ভূরুঙ্গামারী থেকে রংপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে ফিরছিলেন। বাড়ি থেকে মাত্র ২০ কিলোমিটার দূরে এসে এমন দুর্ঘটনা ঘটবে, কেউ ভাবেননি।

দুর্ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশেরতল বাজারের কাছে দুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে মাইক্রোবাসটি। ভেতরে ছড়িয়ে রয়েছে এক্স-রে রিপোর্ট, চিকিৎসাপত্র, রোগীর বালিশ সবকিছুই যেন শেষ মুহূর্তের নীরব সাক্ষী। একটি পানির বোতল পড়ে আছে; হয়তো শেষ চুমুকটুকুও আর নেওয়া হয়নি।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ভূরুঙ্গামারী থেকে পাথরবোঝাই একটি ট্রাক নাগেশ্বরীর দিকে আসছিল। অন্যদিকে মাইক্রোবাসটি বিপরীত দিক থেকে আসছিল। বাঁশেরতল এলাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষের পর ট্রাকটি মাইক্রোবাসটিকে প্রায় ৬০-৭০ গজ টেনে নিয়ে যায়।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বলেছেন, ‘বিকট শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে দেখি মাইক্রোবাসে ১৪-১৫ জন মানুষ আহত অবস্থায় পড়ে আছে। আমি নিজেই ভ্যানে করে কয়েকজনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই।’

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী কাদের বলেছেন, ‘সংঘর্ষের পর শুধু আর্তনাদই শুনছিলাম।’

নাগেশ্বরী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ হিল জামান বলেছেন, ‘খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। থানায় তিনটি লাশ আনা হয় এবং আইনি প্রক্রিয়া শেষে সেগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’

 প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর