বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ভয়াল ২৯ এপ্রিল

স্বজন হারানোদের কান্নায় এখনও ভারী হয়ে ওঠে উপকূল

জেলা প্রতিনিধি, কক্সবাজার
প্রকাশিত: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

স্বজন হারানোদের কান্নায় এখনও ভারী হয়ে ওঠে উপকূল

উপকূলবাসীর কাছে ২৯ এপ্রিল মানেই শোক-বেদনা আর হারানোর দীর্ঘশ্বাস। ১৯৯১ সালের এই দিনে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারসহ দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে চালিয়েছিল নজিরবিহীন ধ্বংসযজ্ঞ। রাতের অন্ধকারে মুহূর্তেই লন্ডভন্ড হয়ে যায় জনপদ, বিলীন হয়ে যায় হাজারো পরিবার।

cox_1


বিজ্ঞাপন


সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সেই ভয়াবহ দুর্যোগে প্রাণ হারান এক লাখ ৩৮ হাজার ৮৮২ জন মানুষ। বাস্তবে এ সংখ্যা আরও বেশি বলে ধারণা করা হয়। অগণিত মানুষ হারান তাদের ঘরবাড়ি, সহায়-সম্বল, আর প্রিয়জনদের।

সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি আজও তাড়িয়ে বেড়ায় কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার ধলঘাটা ইউনিয়নের সুতরিয়া এলাকার বাসিন্দা আবুল কাশেম (৬৫)-কে। তিনি জানান, ২৬ এপ্রিল থেকেই শুরু হয়েছিল ঝড়-বৃষ্টি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংকেত বাড়ছিল, কিন্তু অভিজ্ঞতার অভাবে কেউ এলাকা ছাড়েননি।

cox_3

কাশেম বলেন, ‘২৯ এপ্রিলের রাতে প্রায় ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস সবকিছু ভাসিয়ে নেয়। বাবা-মা, ভাই-বোন— সবাইকে হারিয়েছি। তাদের মরদেহ পর্যন্ত খুঁজে পাইনি। ৩৬ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু এই দিন এলেই সব স্মৃতি নতুন করে জেগে ওঠে।’


বিজ্ঞাপন


তিনি আরও জানান, দুর্যোগের পর এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বসতি গড়লেও হারানো স্বজনদের স্মৃতি আজও তাকে তাড়া করে।

cox_4

আবুল কাশেমের মতো এমন অসংখ্য মানুষ এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন সেই রাতের দুঃসহ স্মৃতি। অনেক পরিবার পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ স্বামী বা স্ত্রী, কেউবা ভাই-বোন— শোকের এই ভার আজও বহন করে চলেছে উপকূলবাসী।

ধলঘাটার বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী মিছবাহ উদ্দিন জানান, ২৯ এপ্রিল ধলঘাটা বাসীর কাছে একটি বেদনার রাত৷ এদিন শতশত মানুষ হারিয়েছে আপনজন। সাগরে তলিয়ে গেছে ঘরবাড়ি, পশুপাখি ও মানুষের স্বপ্ন। দ্বীপ ছাড়া হয়েছিল হাজারো পরিবার। এখনো সেই বিভীষিকাময় রাতের কথা মনে পড়লে স্বজন হারানোর বেদনায় আঁতকে ওঠেন অনেকে।

cox_5

জানা যায়, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল উপকূলীয় এলাকায় ৯ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করা হয়েছিল। তবে যথাযথ প্রস্তুতি ও সচেতনতার অভাবে অধিকাংশ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাননি। রাত ১০টার পর ১০ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলে আঘাত হানে, যা মুহূর্তেই গ্রাম-গঞ্জ তলিয়ে দেয়।

cox_6

প্রতি বছর এই দিনে উপকূলীয় অঞ্চলে মিলাদ মাহফিল, দোয়া, আলোচনা সভা, র‌্যালি এবং দুস্থদের মধ্যে খাবার বিতরণের মাধ্যমে নিহতদের স্মরণ করা হয়। তবে শোকের পাশাপাশি সামনে আসে উপকূলের নিরাপত্তাহীনতার চিত্রও।

স্থানীয়রা জানান, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, ঈদগাঁও, কক্সবাজার সদর ও টেকনাফের অনেক বেড়িবাঁধ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এতে লাখো মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন।

cox_100

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, বর্তমানে জেলায় ৫ শতাধিক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। পুরোনো অনেক শেল্টারের পরিবর্তে নতুন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। মানুষ এখন আগের তুলনায় অনেক সচেতন। দুর্যোগের পূর্বাভাস পেলেই তারা আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যান, ফলে প্রাণহানি অনেক কমেছে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আশ্রয়কেন্দ্র বৃদ্ধি নয়, টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, আগাম সতর্কতা জোরদার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা আরও বাড়ানো জরুরি।

৩৬ বছর পরও ১৯৯১ সালের সেই ভয়াল ২৯ এপ্রিল উপকূলবাসীর হৃদয়ে এক গভীর ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে— যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি, বরং প্রতি বছর নতুন করে বেদনা জাগিয়ে তোলে।

প্রতিনিধি/ এজে

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর