শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

জরুরি টিকাদান শুরু 

রাজবাড়ীতে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক: হাসপাতালে শিশুদের ভিড়

জেলা প্রতিনিধি, রাজবাড়ী
প্রকাশিত: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:৩৯ পিএম

শেয়ার করুন:

রাজবাড়ীতে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক: হাসপাতালে শিশুদের ভিড়

রাজবাড়ী জেলাজুড়ে হামের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জেলা সদর হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী ভর্তি হওয়ায় অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে আরও ৫ জন শিশু ভর্তি হয়েছে। এই নিয়ে বর্তমানে হাসপাতালটিতে মোট ১৪ জন শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে।

রাজবাড়ী জেলা সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. শেখ মো. আব্দুল হান্নান আজ এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গতকাল পর্যন্ত ১০ জন শিশু ভর্তি ছিল। নতুন ৫ জনসহ মোট ১৫ জনের মধ্যে একজন সুস্থ হয়ে আজ বাড়ি ফিরে যাওয়ায় বর্তমানে ১৪ জন চিকিৎসাধীন। ভর্তিকৃত শিশুদের অধিকাংশেরই বয়স ৬ মাস থেকে ৫ বছরের মধ্যে।


বিজ্ঞাপন


সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১৩৬ জন শিশু হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে শুধু চলতি বছরেই ৬৫ জন শিশুকে সন্দেহভাজন হিসেবে হাসপাতালে আনা হয়। ল্যাব পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত ৪ জন শিশুর শরীরে সরাসরি হামের ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। তবে স্বস্তির বিষয় হলো, শনাক্ত হওয়া চারজনই উন্নত চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

হাসপাতালের বারান্দায় চিন্তিত মুখে বসে থাকা সুলতানা বেগম বলেন, তিন দিন আগে হঠাৎ করেই ছেলের ধুম জ্বর আসে, সেই সঙ্গে গা দিয়ে ছোট ছোট লাল দানা বের হতে থাকে। প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ ঘামাচি, কিন্তু জ্বর না কমায় হাসপাতালে নিয়ে আসি। ডাক্তাররা বলেছেন হাম হয়েছে। আশপাশে আরও অনেক শিশুর এই অবস্থা দেখে খুব ভয় লাগছে। তবে হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা পেয়ে এখন ছেলে একটু ভালো আছে।

নিজের দেড় বছরের মেয়েকে কোলে নিয়ে রহমত আলী বলেন, আমার মেয়েটা ঠিকমতো খেতে পারছিল না, চোখগুলো একদম লাল হয়ে গিয়েছিল। পাশের বাড়ির একজনের পরামর্শে হাসপাতালে নিয়ে আসি। এখানে আসার পর বুঝলাম এটা হাম। সঠিক সময়ে না আনলে হয়ত বড় কোনো বিপদ হতে পারত। এখন শুধু সুস্থ হওয়ার অপেক্ষায় আছি।

আরও পড়ুন

হামের উপসর্গে একদিনে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু

গোয়ালন্দ মোড় এলাকা থেকে আসা শিউলি আক্তার বলেন, আমার বড় ছেলেটাকে নিয়মিত টিকা দিয়েছিলাম, কিন্তু ছোটটার বেলা একটু দেরি হয়ে গিয়েছিল। এখন সেই ছোট ছেলেই হামে আক্রান্ত। পাড়ার আরও কয়েকটা বাচ্চারও একই অবস্থা। যারা এখনো টিকা দেয়নি, তাদের বলব তাড়াতাড়ি টিকা দিয়ে দিতে। আমাদের মতো যেন কাউকে হাসপাতালে দিন কাটাতে না হয়।

সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদ বলেন, আমরা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও আলাদা ওয়ার্ডে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আতঙ্কিত না হয়ে সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে এই রোগ থেকে দ্রুত মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

হামের এই সংক্রমণ রুখতে জেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। গত ২০ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ ক্যাম্পেইন আগামী ১০ মে পর্যন্ত চলবে। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রাজবাড়ীতে এবার ১ লাখ ১৭ হাজার ৬৬০ জন শিশুকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সিভিল সার্জন আরও জানান, ৬ মাস থেকে ৫ বছরের কম বয়সী সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি যারা আগে রুটিন মাফিক টিকা নিয়েছে, তারাও এই বিশেষ ডোজটি নিতে পারবে। জেলা তথ্য অফিসের মাধ্যমে শহর ও গ্রাম পর্যায়ে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করে অভিভাবকদের সচেতন করা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হঠাৎ উচ্চ জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে দানা ওঠাই হামের প্রধান লক্ষণ। আক্রান্ত শিশুদের প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার, ডাবের পানি এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে। বিশেষ করে শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার মতো জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক বায়ুবাহিত রোগ হওয়ায় আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখার ওপর জোর দিয়েছেন স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। চলমান টিকাদান কর্মসূচিতে সব শিশুকে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, টিকাই হাম প্রতিরোধের একমাত্র কার্যকর উপায়।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর