প্রকৃতি যেন নিজেই এঁকেছে এক অপূর্ব ছবি। পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালি ইউনিয়নের কৈবর্তখালী গ্রাম এখন সূর্যমুখীর হাসিতে ভরপুর। যেখানে একসময় ছিল শুধুই ধানখেত, সেখানে আজ জন্ম নিয়েছে কৃষকের নতুন সম্ভাবনা। প্রকৃতির এই অপূর্ব রূপ সৌন্দর্য আর কৃষকের স্বপ্ন মিলেমিশে কৈবর্তখালী গ্রামটি এখন যেন এক জীবন্ত উৎসবের আঙিনা।
এ দৃশ্য পিরোজপুর সদর উপজেলার কলাখালী ইউনিয়নের কৈবর্তখালী গ্রামের। হলুদের সমারোহে সাজানো এই মাঠ যেন প্রকৃতির এক অনন্য ক্যানভাস। সূর্যমুখী চাষে কৃষকের নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে যাওয়ার পাশাপাশি গ্রামটির সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকজন। স্থানীয় এবং জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত দর্শনার্থীরা ভিড় করেন সূর্যমুখীর এই মাঠে। সূর্যমুখীর এমন বিস্তীর্ণ চাষ শুধু সদর উপজেলায় নয় বরং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় এর চাষ করা হয়েছে। এক সময় যেখানে ধান কিংবা অন্যান্য ফসল ছিল প্রধান, সেখানে এখন জায়গা করে নিচ্ছে সূর্যমুখী চাষ। কম খরচ, কম শ্রম আর লাভজনক ফসল হওয়ার কারণে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে এই চাষে।
বিজ্ঞাপন

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, চলতি মৌসুমে জেলার ৭ উপজেলায় প্রায় ৯৮৪ হেক্টর জমিতে সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে। এবারে বীজ উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছে প্রতি হেক্টরে দুই থেকে আড়াই টন। যার বাজার মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
কৃষকরা বলছে, পর্যাপ্ত সরকারি প্রণোদনা ও কার্যকর সহায়তা, বিনা সুদে ঋণ মিললে এই সম্ভাবনাময় চাষে স্থানীয় কৃষকেরা আরো বেশি উদ্বুদ্ধ হবে। এছাড়াও বর্তমান সরকারের কৃষি কার্ড পেলে কৃষকেরা আরও বেশি চাষাবাদে আগ্রহী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এদিকে বিকেল হলেই কৈবর্ত্যখালী গ্রামের এই সূর্যমুখী খেত পরিণত হয় দর্শনার্থীদের মিলনমেলায়। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে ঘুরতে আসেন, ছবি তোলেন এবং প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। স্থানীয়দের মতে, এই খেতটি এখন এলাকার একটি ছোট পর্যটন কেন্দ্র।
বিজ্ঞাপন

সূর্যমুখী চাষি খোকন বলেন, আমরা প্রতিবছর শুধুমাত্র ধান উৎপাদন করি কিন্তু এই বছর প্রথম সূর্যমুখী চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। কৃষি অফিস থেকে বীজ দিয়ে সহায়তা করেছে। সরকার যদি আমাদের সহজ শর্তে ঋণ দিত তাহলে ভালো হতো। তবে আমাদের দেখাদেখি আগামীতে আরও অনেক চাষি সূর্যমুখী আবাদ করবে।
স্থানীয় অন্য এক চাষি মোস্তফা হাওলাদার বলেন, আমি এক বিঘায় সূর্যমুখী আবাদ করেছি এ বছর। এর আগে কখনো সূর্যমুখী চাষ করেনি। সূর্যমুখী চাষ অনেক লাভজনক। শুনেছি সরকার কৃষি কার্ড দিচ্ছে, যদি আমাদের এলাকায় কৃষি কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা করত তাহলে ভালো হতো। সূর্যমুখী তেল অনেক উপকারী, নিজের পরিবারের জন্য তেল রেখে বাকিটা বিক্রি করে দেব।
অন্য আরেক চাষি রফিক উদ্দিন বলেন, সূর্যমুখী চাষ বেশি লাভজনক। সূর্যমুখী চাষ করেছি, ফলন ভালো হয়েছে। আর কিছুদিন পরেই পরিপূর্ণভাবে তেল উৎপাদনের জন্য তৈরি হবে। সূর্যমুখী শুধু একটি ফসল নয়, ফুল ফোটার পর এলাকায় অনেক মানুষ ঘুরতে আসে। অনেক দূর থেকেও ঘুরতে আসে, ছবি তোলে, আমাদের কাছেও দেখে ভালো লাগে।
নেছারাবাদ উপজেলা থেকে ঘুরতে এসেছেন মুন্নি আক্তার তিনি বলেন, নেছারাবাদ থেকে ঘুরতে এসেছি এই সূর্যমুখী ফুলের বাগানে। অনেক সুন্দর লাগছে পরিবারের সাথে এসে। সূর্যমুখী ফুল দেখতে অনেক ভালো লাগে, অনেক ছবি তুলেছি, ফুলগুলো অনেক সুন্দর।

পিরোজপুর শহর থেকে ঘুরতে এসেছেন আরমান ইসলাম, তিনি বলেন, শুধু মেয়েরা নয়, ছেলেরাও ফুল অনেক ভালোবাসে। আমরা এখানে এসেছি, বন্ধুরা মিলে, সূর্যমুখী ফুলগুলো দেখতে অনেক ভালো লাগতেছে। শুধু মেয়েরা ফুল ভালোবাসে বিষয়টা এমন নয়, ছেলেরাও ফুল পছন্দ করে। মনে যদি কোনো কষ্ট থাকে আর তিনি যদি এই সূর্যমুখী বাগানে আসে, তাহলে তার মন ভালো হয়ে যাবে।
পিরোজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (খামারবাড়ি) উপ-পরিচালক সৌমিত্র সরকার বলেন, কৃষকদের বীজ সরবরাহ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত মাঠ পরিদর্শনের মাধ্যমে সার্বিক সহায়তা করা হচ্ছে। পিরোজপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় যে পরিমাণ সূর্যমুখীর আবাদ হয়েছে তার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় বিশ কোটি টাকা। আগামী বছর সূর্যমুখীর আবাদ আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কৈবর্তখালী এখন শুধু ফসলের মাঠ নয় বরং প্রতিটি সূর্যমুখী ফুল যেন কৃষকের সমৃদ্ধি আর আগামীর নতুন সম্ভাবনার কথা বলছে।
প্রতিনিধি/এসএস




