ফেসবুকের নিউজফিডে অসংখ্য ভিডিওর ভিড়ে হঠাৎ ভেসে আসে এক তরুণীর গান। আর মুহূর্তেই থেমে যায় আঙুলের স্ক্রল। সুরেলা কণ্ঠ, মায়াভরা গায়কী আর নিখুঁত পরিবেশনায় শ্রোতার হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়া তরুণীটি ঠাকুরগাঁওয়ের মনামি রায়। বাংলা আধুনিক থেকে রবীন্দ্রসংগীত, নজরুল, লালন কিংবা ভক্তিমূলক গান। প্রতিটি গানে তিনি যেন ছড়িয়ে দেন অনুভূতির এক আলাদা জগৎ। পড়াশোনার ব্যস্ততার মাঝেও গানকে সঙ্গী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধীরে ধীরে হয়ে উঠছেন নতুন প্রজন্মের এক পরিচিত মুখ।
বর্তমানে মনামি রায় ঠাকুরগাঁও ইকো কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের এইচএসসি-২০২৬ সালের পরীক্ষার্থী। পড়াশোনার চাপের মধ্যেও গানকে কখনো দূরে সরিয়ে রাখেননি তিনি। বরং বইয়ের পাতার ফাঁকে ফাঁকেই সময় বের করে নিয়মিত গান পরিবেশন করেন এবং তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। তার বিশ্বাস—ভালোবাসার জায়গা থেকে করা কাজ একদিন মানুষের হৃদয়ে পৌঁছায়।
বিজ্ঞাপন

ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম নেওয়া মনামি ছোটবেলা থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত। নাচ, আবৃত্তি ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ছোটবেলা থেকেই নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে অর্জন করেছেন প্রশংসা ও সাফল্যও। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি উপলব্ধি করেন, গানই তার সবচেয়ে আপন, সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশের মাধ্যম।
সংগীতে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার শুরু হয় আখাউড়া শিল্পকলা একাডেমি থেকে। সেখানেই সঙ্গীতের মৌলিক শিক্ষা তার কণ্ঠকে করে তোলে আরও পরিণত। সেই শিক্ষার ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে ভালোবাসা, নিষ্ঠা ও নিরন্তর অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের গায়কীকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন
মনামির গানের বিশেষত্ব শুধু তার কণ্ঠে নয়, তার পরিবেশনাতেও। প্রতিটি গানে তিনি অনুভূতি মিশিয়ে দেন এমনভাবে, যা সহজেই ছুঁয়ে যায় শ্রোতার মন। এ কারণেই সামাজিক মাধ্যমে তার গান কেবল শোনা হয় না, অনুভবও করা হয়।
ডিজিটাল এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অনেক তরুণ প্রতিভার জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। মনামি রায়ও সেই সম্ভাবনারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ। নিজের ঘর থেকেই তিনি পৌঁছে যাচ্ছেন অসংখ্য মানুষের কাছে, তৈরি করছেন নিজস্ব পরিচয়।

মনামী রায় বলেন, আমার গানের যাত্রা শুরু হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া শিল্পকলা একাডেমি থেকে। আমার বাবা-মা দুজনই সাংস্কৃতিকমনা মানুষ। আমার বাবাও গান করেন। সেই ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি আমার এক বিশেষ টান ছিল। সেখান থেকেই আমার গান শেখা এবং নৃত্য শেখার শুরু। এরপর আমি বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে শুরু করি এবং ভালো ফলাফল অর্জন করি। সরকারি প্রতিযোগিতাগুলোতে অংশ নিয়ে বিভাগীয় পর্যায়েও আমি ভালো সাফল্য পেয়েছি।

তিনি আরও বলেন, গানের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য আমি দুইবার ভারতেও গিয়েছিলাম। সেখান থেকেও আমি ভালো সুনাম অর্জন করে দেশে ফিরেছি। পড়ালেখাতেও আমি সবসময় ভালো ছিলাম। আমি কখনোই চাইনি গান ছেড়ে দিতে। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি গানকেও ধরে রাখতে চেয়েছি। ভবিষ্যতেও আমি পড়ালেখার পাশাপাশি গানকে সঙ্গে নিয়েই আরও এগিয়ে যেতে চাই।
গানের শিক্ষক লক্ষ্মীকান্ত রায় বলেন, মনামি রায়ের কণ্ঠে যে স্বচ্ছতা, মাধুর্য আর আবেগের প্রকাশ দেখা যায়, তা তার বয়সের তুলনায় সত্যিই প্রশংসনীয়। সবচেয়ে ভালো লাগে, সে শুধু গান গায় না—গানের কথাগুলোও অনুভব করে পরিবেশন করার চেষ্টা করে। একজন শিল্পীর জন্য এই গুণটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত চর্চা, সঠিক তালিম এবং একাগ্রতা ধরে রাখতে পারলে ভবিষ্যতে সে সংগীতাঙ্গনে আরও বড় জায়গা করে নিতে পারবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
মনামি রায়ের স্বপ্ন, গানকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যাওয়া। ভবিষ্যতে নিজেকে একজন প্রতিষ্ঠিত সংগীতশিল্পী হিসেবে দেখতে চান তিনি। তার এই পথচলা বলে দেয়—সত্যিকারের প্রতিভা সুযোগের অপেক্ষায় বসে থাকে না, বরং নিজেই নিজের পথ তৈরি করে নেয়।
প্রতিনিধি/টিবি




