সরকার পরিবর্তন হলে সাধারণত পরিবর্তন আসে বিভিন্ন সরকারি সংস্থায়। এরই ধারাবাহিকতায় এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চেয়ারম্যান নিয়োগ। বর্তমানে এ পদে আসীন আছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিয়োগ দেওয়া প্রকৌশলী মো. নুরুল করীম।
তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এ পদে এখন আলোচনায় আসছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতার নাম। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ভাষ্যমতে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান পদে এমন কেউ আসবেন, যিনি বিগত আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের আমলে দলের জন্য অবদান রাখতে গিয়ে পদে পদে নির্যাতিত হয়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। একইসাথে সৎ ও নীতিবান কাউকে এ পদে দলীয় নীতি-নির্ধারকরা স্থলাভিষিক্ত করবেন—এমনটাই প্রত্যাশা তৃণমূলের।
বিজ্ঞাপন
নেতাকর্মীরা জানান, এই পদের জন্য ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজনের নাম আলোচনায় উঠে এসেছে। তারা হলেন—চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর, কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শামসুল আলম, মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নিয়াজ মোহাম্মদ খান, শওকত আজম খাজা, ইয়াছিন চৌধুরী লিটন এবং ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার।
আবুল হাশেম বক্কর
২০১৭ সালের ৭ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক ছিলেন আবুল হাশেম বক্কর। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন বিএনপির হাইকমান্ডের আস্থাভাজন ডা. শাহাদাত হোসেন, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র। রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে বক্কর বারবার আওয়ামী লীগের রোষানলে পড়েছিলেন।
চউকের চেয়ারম্যান পদের বিষয়ে জানতে চাইলে আবুল হাশেম বক্কর বলেন, "দলের শীর্ষ নেতা ও নীতি-নির্ধারকরা আছেন। তারা যে সিদ্ধান্ত নেবেন, যাকে দায়িত্ব দেবেন তিনিই চউকের চেয়ারম্যান পদে আসীন হবেন। আমি পদটি চাইতেই পারি, কিন্তু চাইলেই যে পাবো তা নিশ্চিত নয়।" তিনি আরও বলেন, "আওয়ামী দুঃশাসনের আমলে আমি চরম মৃত্যুঝুঁকিতে ছিলাম। গুম বা ক্রসফায়ারের আতঙ্ক নিয়ে সময় কাটলেও রাজপথ ছাড়িনি। আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক ডজনখানেক মামলা এখনও চলমান।"
শামসুল আলম
চউকের চেয়ারম্যান হিসেবে আলোচনায় আছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শামসুল আলম। বিএনপির রাজনীতি করতে গিয়ে গত দেড় দশকে তিনি ব্যবসায়িক ও আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এবার তিনি দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও তা পাননি, যার ফলে তাকে এই পদে মূল্যায়নের গুঞ্জন চলছে। বাকলিয়ার ঐতিহ্যবাহী পরিবারের সন্তান শামসুল আলম কোতোয়ালী থানা বিএনপির সভাপতি ও নগর বিএনপির সহ-সভাপতি ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সামান্য ব্যবধানে পরাজিত হন।
নিয়াজ মোহাম্মদ খান
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নিয়াজ মোহাম্মদ খান নগরীর পাঠানটুলি ওয়ার্ডের কয়েকবারের কাউন্সিলর ছিলেন। তিনি সিটি কর্পোরেশনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র ও সিডিএর বোর্ড সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সিডিএ নিয়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকায় তিনি আলোচনায় আছেন। তিনি বলেন, ‘দায়িত্ব পেলে চট্টগ্রামের উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে চাই।’
বিজ্ঞাপন
শওকত আজম খাজা
মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শওকত আজম খাজা নগর রাজনীতিতে এক আলোচিত নাম। সাবেক এই ছাত্রনেতার দেশজুড়ে পরিচিতি রয়েছে। আন্দোলন-সংগ্রামের প্রথম সারির এই নেতা চট্টগ্রাম-১ (মীরসরাই) আসন থেকে এবার দলীয় মনোনয়ন চেয়েও বঞ্চিত হয়েছেন। ফলে চউকের দায়িত্ব পালনে তাকে বিবেচনায় রাখা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইয়াছিন চৌধুরী লিটন
চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ইয়াছিন চৌধুরী লিটন ইতিপূর্বে নগর যুবদল ও ছাত্রদলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তৃণমূল থেকে উঠে আসা এই নেতা বিগত দেড় দশকে প্রতিটি আন্দোলনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সক্রিয় ছিলেন। তার একনিষ্ঠতা বিবেচনায় তাকে মূল্যায়ন করা হতে পারে বলে অনুসারীরা মনে করেন।
আজিম উল্লাহ বাহার
চউকের চেয়ারম্যান পদে নিয়োগের জল্পনায় শক্ত অবস্থানে আছেন ফটিকছড়ি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক কর্নেল (অব.) আজিম উল্লাহ বাহার। সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা ত্যাগ ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিজেকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা-হামলা হলেও তিনি নীতি থেকে বিচ্যুত হননি। চট্টগ্রামের সচেতন মহল মনে করে, সিডিএর মতো কারিগরি ও প্রশাসনিক সংস্থায় একজন সুশৃঙ্খল ও দক্ষ অভিভাবক প্রয়োজন। সেই বিচারে কর্নেল বাহারের সততা ও নেতৃত্বগুণ কাজে লাগতে পারে। তবে এ বিষয়ে কথা বলতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
চউকের বর্তমান পরিস্থিতি
চউক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমকে তিন বছর মেয়াদের জন্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। শর্তানুযায়ী যোগদানের তারিখ থেকে পরবর্তী তিন বছর তার দায়িত্ব পালনের কথা। সেই হিসেবে বর্তমান চেয়ারম্যানের মেয়াদ এখনও অনেকটা বাকি থাকলেও নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে চেয়ারম্যান পদের পরিবর্তন নিয়ে গুঞ্জন তুঙ্গে।
প্রসঙ্গত, ২০০৯ সাল থেকে এই পদে চুক্তিভিত্তিক রাজনৈতিক নিয়োগ দেওয়ার প্রথা চলে আসছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তৎকালীন চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইউনুছের নিয়োগ বাতিল করে অন্তর্বর্তী সরকার প্রকৌশলী মো. নুরুল করিমকে দায়িত্ব দেয়। একই সময়ে বোর্ডে আরও ৬ জন সদস্যকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
প্রতিনিধি/একেবি




