একসময় নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় বিনোদনের প্রধান কেন্দ্র ছিল সিনেমা হল। সন্ধ্যা নামলেই দর্শকের ঢল নামত এসব হলে। তবে কালের বিবর্তনে সেই সোনালি দিন এখন শুধুই স্মৃতি। একে একে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হলগুলোর জায়গায় এখন গড়ে উঠেছে বসতি, মাদরাসা ও বিভিন্ন ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় প্রবীণ দর্শকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের মধ্যে হাতিয়ার ওছখালী শহরের জিরো পয়েন্টের পশ্চিম পাশে প্রথম সিনেমা হলটি নির্মাণ করেন ভোলা জেলার নান্নু চৌধুরী। এর দুই বছর পর তিনি উপজেলার জাহাজমারা বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশে আনুল্লা মিয়ারগো বাড়ির সামনে আরেকটি সিনেমা হল গড়ে তোলেন।
বিজ্ঞাপন

এদিকে, উপজেলার আফাজিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে ভুলু সর্দারের বাড়ির দরজায় স্থানীয় নেছার মিয়া আরেকটি সিনেমা হল নির্মাণ করেন। সে সময় এসব হলে ব্যাপক দর্শকের সমাগম হতো। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে সিনেমা উপভোগ করতেন—ছিল এক অন্যরকম উৎসবমুখর পরিবেশ।
সিনেমা প্রদর্শনের দিনক্ষণ ও চলচ্চিত্রের প্রচারণা চালাতেন আলাউদ্দিন আলো নামের এক সংস্কৃতিপ্রেমী।
রিকশায় মাইক লাগিয়ে পুরো এলাকায় ঘুরে তিনি সিনেমার প্রচার করতেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সংলগ্ন একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে কর্মরত।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, সময়ের পরিবর্তনে সিডি ও ভিসিডির আগমন ঘটলে ধীরে ধীরে মানুষ সিনেমা হল বিমুখ হয়ে পড়ে। এতে দর্শক কমে গিয়ে মালিকপক্ষ লোকসানের মুখে পড়েন এবং একপর্যায়ে হলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

ওছখালী জিরো পয়েন্টের পশ্চিম পাশে তমরোদ্দি রোডস্থ রং মিস্ত্রি মনির জানান, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সিনেমা হলটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ব্যবসায়ী ফয়েজ ও তার ভাই জায়গাটি কিনে এখানে দোকানপাট নির্মাণ করেন এবং পেছনের অংশে বসতঘর গড়ে তোলেন।
জাহাজমারা বাসস্ট্যান্ডের দক্ষিণ পাশের হলটির জায়গা একটি হিন্দু পরিবার ক্রয় করে বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। বর্তমানে সে বাড়িতে চারটি হিন্দু পরিবার বসবাস করছে।
অন্যদিকে, আফাজিয়া বাজারের দক্ষিণ পাশে ভুলু সর্দারের বাড়ির জায়গায় গড়ে উঠেছে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় ইসমাইল হোসেন জানান, “সমাজে ধর্মীয় চেতনাবোধ বাড়ার কারণে হলটি চালুর দুই-তিন বছরের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়।”
সমাজকর্মী দুলাল উদ্দিনের মতে, “সিডি-ভিসিডির প্রসার, দর্শক সংকট ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন—সব মিলিয়েই সিনেমা হলগুলো টিকে থাকতে পারেনি।”
সিনেমা হলগুলোর বিলুপ্তির ফলে একদিকে যেমন প্রজন্মের একটি অংশ বিকল্প বিনোদনের অভাবে মোবাইলনির্ভর হয়ে পড়ছে,
অপরদিকে, বিনোদনপ্রেমীরা এখন ছুটে যান প্রকৃতির কাছে। হাতিয়ার সমুদ্র সৈকত- নিঝুম দ্বীপ, কমলার দিঘি কিংবা রহমত বাজার গোলতলা পর্যটন কেন্দ্র—এসব স্থানই এখন বিনোদনের নতুন ঠিকানা।

তবে প্রবীণদের মতে, সিনেমা হল ছিল শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়—এটি ছিল একটি মিলনমেলা, যেখানে মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে সময় কাটাতেন। সেই ব্যবস্থাটি হারিয়ে যাওয়ায় সমাজজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অধ্যায়ও যেন নিঃশব্দে বিদায় নিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, আধুনিকতার পাশাপাশি সুস্থ বিনোদনের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। যাতে নতুন প্রজন্ম প্রযুক্তিনির্ভর একাকিত্ব থেকে বেরিয়ে এসে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবারও যুক্ত হতে পারে।
প্রতিনিধি/এসএস




