বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

লোহাগড়ায় মৎস্য অফিসের ৬০ গরু বিতরণ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো নানা অসংগতি

জেলা প্রতিনিধি, নড়াইল
প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম

শেয়ার করুন:

লোহাগড়ায় মৎস্য অফিসের ৬০ গরু বিতরণ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো নানা অসংগতি

দেশীয় প্রজাতির মাছ, শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার ১২ ইউনিয়নে ও ১টি পৌরসভায় দরিদ্র জেলেদের মাঝে ৬০টি বকনা গরু বিতরণ কর্মসূচির তথ্য গোপন করেছে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শিরোনামে বিভিন্ন পত্রিকায় ও অনলাইনে নিউজ প্রকাশিত হলে নড়েচড়ে বসে উপজেলা প্রশাসন।

তারই ধারাবাহিকতায় গত (১৩ এপ্রিল) সোমবার বিকেলে লোহাগড়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা মাসুম খান ৬০ জন জেলেকে গরু বিতরণ করেছেন সে তালিকা প্রদান করেন সাংবাদিকদের।


বিজ্ঞাপন


২০২৫/২৬ অর্থ বছরে ওই প্রকল্পের আওতায় লোহাগড়া উপজেলায় দরিদ্র জেলেদের মাঝে ৬০টি বকনা গরু ও খাবার বিনামূল্যে প্রদান করা তালিকায় ৬০ জন জেলের নাম, বাবার নাম, গ্রাম, ইউনিয়ন, মোবাইল নম্বরসহ স্বাক্ষর/টিপ সই আছে। তালিকা নিয়ে সাংবাদিকরা অনুসন্ধানে মাঠে নামলে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, উপজেলা মৎস্য অফিস কর্তৃক প্রদত্ত তালিকায় থাকা ৯ নম্বর সদস্য মল্লিকপুর ইউনিয়নের পাঁচুড়িয়া গ্রামের বাসার মল্লিক তার নামের পাশে লেখা মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ইসরাফিল সরদার বাড়ি মল্লিকপুর, আমি কোনো গরু পাই নাই।

এছাড়া তালিকার ১০ নম্বর সদস্য ধলাইতলা গ্রামের সুজন শেখের মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে তিনি বলেন, আমি কোনো গরু পাই নাই, আমি মল্লিকপুর ইউনিয়নের মেম্বার নুরুজ্জামান। তালিকার ১১ নম্বর সদস্য খোকন শরীফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বাড়ি মাদারীপুর সদরে আমি গরু সম্পর্কে কিছুই জানি না, আমি কেন নড়াইল গরু আনতে যাব?

এদিকে ১২ নম্বর সদস্য জুয়েল মোল্যার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আমি সরকারি কর্মকর্তা, পরমাণু কমিশনে চাকরি করি। আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জ নাম কাদির। মজার ব্যাপার হলো তার নামের পাশে স্বাক্ষরের জায়গায় টিপ সই দেওয়া হয়েছে।


বিজ্ঞাপন


তালিকায় থাকা ১৭ নম্বর সদস্য রুপাইয়ের বাড়ি গেলে তাকে পাওয়া যায়নি, কিন্তু তার আপন চাচাতো ভাই লিমন সিকদার বলেন, কোনো গরু পাই নাই, আমি এর বিচার চাই। ২৭ নাম্বার সদস্য মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি ছোট একটা বকনা গরু পেয়েছি ছাগলের মতো যার মূল্য আনুমানিক ১০/১৫ হাজার টাকা হতে পারে। কিন্তু এই গরু বাবদ আমার কাছ থেকে ফেরদৌস নামে এক ব্যক্তি ৯ হাজার টাকা নিয়েছে।

আরও পড়ুন

লোহাগড়ায় অনুদানের ৬০ গরু গেল কার গোয়ালে!

৩৭ নম্বর তালিকায় থাকা গনি মোল্যার নামের পাশে মোবাইল নম্বরে ফোন দিলে কিশোরগঞ্জের ভৈরবের শিল্পী নামের মহিলা বলেন, আপনারা কেন বিরক্ত করছেন, আমি কেন নড়াইল কেন গরু আনতে যাব? আমি কোনো গরু পাই নাই। দয়া করে আর ফোন দেবেন না।

উল্লেখ্য যে, মৎস্য কর্মকর্তা মাসুম খান ৬০ জন উপকার ভোগী দরিদ্র জেলের নাম উল্লেখ্য করে একটি তালিকা শুধু দেন। তবে এ প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ, প্রতিটি গরুর ওজন, কত টাকা মূল্য নির্ধারণ করেছে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য বা কাগজপত্র দেননি।

এ ঘটনায় লোহাগড়া উপজেলায় চলছে আলোচনা ও সমালোচনা। তবে নেটিজেনদের ধারণা ঘটনার মূল হোতা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাসুম খান। তার দৃষ্টান্ত মুলক শাস্তি দাবি করেছেন অনেকেই। ওই তালিকায় উপজেলার ৫ জন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা স্বাক্ষর করেছেন, তবে প্রকল্পের বিষয়ে কেউ খোঁজ খবর নেননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্বাক্ষরিত কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তা ড. শ্যামল চন্দ্র রায় বলেন, বিষয়টি সম্পূর্ণ মৎস্য কর্মকর্তার ব্যাপার। সব যাচাই-বাছাই মৎস্য অফিস করবেন। যেহেতু বিষয়টি উনার দফতরের। তিনি আমাদেরকে বলেন, ডিসি স্যার, ডিএলও স্যার এবং ডিএফও স্যার থাকবেন সে কারণে আমরা যাচাই করি নাই। আমি বলেছিলাম লোহাগড়ায় বিতরণ করার জন্য, তখন মৎস্য কর্মকর্তা মাসুম বলেন, সাংবাদিকরা ডিস্টার্ব করবে। যদি কোনো অনিয়ম করেন তার জন্য উনি দায়ী। এ ঘটনায় আমাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে। আমরা চাই প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসুক।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে লোহাগড়া উপজেলার ভারপ্রাপ্ত মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাসুম খান সাংবাদিকদের বলেন, আমি যাদেরকে গরু দিয়েছি তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে দেখছি। আগামী রোববার তাদের অফিসে আসতে বলেছি। নামের পাশে বর্ণিত মোবাইলে ত্রুটির কথা বললে তিনি বলেন, অনেক আগের তালিকা ভুল হতে পারে। বিতরণের আগে কেন এই মোবাইল নম্বর যাচাই বাছাই করেন নাই এই প্রশ্নের কোনো সৎ উত্তর দিতে পারেননি তিনি।

নড়াইল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, বিষয়টি অবগত হয়েছি। এ নিয়ে একটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তের রিপোর্টে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে সেটি দেখে বিভাগীয়ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

লোহাগড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাম্মী কায়সার বলেন, কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে ৩ সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ ঘটনায় নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. আতাউর রহমান বাচ্চুর সঙ্গে সাংবাদিকদের কথা হলে তিনি বলেন, ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে এমন অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে আইনগত ব্যবস্থা নেব।

প্রতিনিধি/এসএস

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর