মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

ট্রাক উল্টে নিহত ৭

একসঙ্গে চারজনের জানাজা ও দাফন আগে দেখেননি ভাইগর গ্রামবাসী

জেলা প্রতিনিধি, দিনাজপুর
প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম

শেয়ার করুন:

একসঙ্গে চারজনের জানাজা ও দাফন আগে দেখেননি ভাইগর গ্রামবাসী

গ্রামের মাঝখানে মাদরাসার মাঠে হাজারো মানুষের নিস্তব্ধ উপস্থিতি। মাঠের পশ্চিম পাশে সারিবদ্ধ চারটি খাটিয়া, তার ওপর সাদা কাফনে মোড়ানো চারটি নিথর দেহ। প্রিয়জনের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে একে অপরকে জড়িয়ে ডুকরে কাঁদছেন স্বজনেরা। 

চারজন মানুষকে একসঙ্গে হারানোর এমন শোকাবহ দৃশ্য এর আগে কখনোই দেখেনি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী ভাইগর গ্রাম। স্বজনদের আহাজারি আর চারপাশের গুমোট বাতাসে আজ শুধু বিষাদের ছায়া।


বিজ্ঞাপন


বুধবার (১৫ এপ্রিল) সকাল সোয়া ৯টার দিকে ভাইগর তালিমুল কোরআন একাডেমি মাঠে দেখা যায় এই হৃদয়বিদারক দৃশ্য। গত সোমবার দিবাগত রাতে কুমিল্লার দাউদকান্দির হাসানপুরে চালবোঝাই একটি ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়লে ট্রাকচাপা পড়ে নিহত হন সাতজন। তাদের মধ্যে চারজনের বাড়িই বিরামপুরের ভাইগর গ্রামে। 

বুধবার সকালে স্থানীয় হাফেজ রিয়াজুল ইসলামের ইমামতিতে তাদের জানাজা সম্পন্ন হয়। 

নিহত ব্যক্তিরা হলেন আবু হোসেন (৪২), বিষু মিয়া (৪৫), সুমন বাবু (২২) ও আবদুর রশিদ (৬৫)। মর্মান্তিক বিষয় হলো, এই চারজনই ছিলেন তাদের নিজ নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি।

এই দুর্ঘটনায় নিহত অন্য তিনজন হলেন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার খালিপপুর গ্রামের আফজাল হোসেন (৩৫), সোহরাব হোসেন (৪০) ও আবু সালেক (৪৫)। 


বিজ্ঞাপন


সকাল সাড়ে ১০টায় ডাঙ্গি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে তাদের জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। তারা সবাই ছিলেন ধানকাটা শ্রমিক; যাতায়াত খরচ বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়েই ট্রাকে চড়ে কাজের সন্ধানে যাচ্ছিলেন বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।

আরও পড়ুন—

ভাইগর গ্রামে একসঙ্গে চারজনের জানাজা ও দাফনের খবরে বিরামপুর ও পার্শ্ববর্তী উপজেলা থেকে হাজারো মানুষ ভিড় করেন। কবরস্থানে নিহত আবু হোসেন ও সুমন বাবুর জন্য কবর খুঁড়ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা বাদল হোসেন। দীর্ঘ চৌদ্দ বছর বয়স থেকে কবর খোঁড়ার কাজ করলেও জীবনে কখনো একই সঙ্গে এমন ভারী পরিস্থিতির মুখোমুখি হননি তিনি। চোখের পানি মুছে তিনি আক্ষেপ করে বললেন, ‘জীবনে কখনো একসঙ্গে চারজনের কবর খুঁড়তে হবে কল্পনাও করিনি। এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’

সন্তান হারানো মা শিরিন সুলতানার বিলাপ যেন আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে। বাবা আর সন্তানদের বারণ সত্ত্বেও জীবিকার তাগিদে আবু হোসেন কুমিল্লায় পাড়ি দিয়েছিলেন। যাওয়ার দিন মা তাকে যত্ন করে পছন্দের খাবার রান্না করে খাইয়েছিলেন। অথচ সেই শেষ খাওয়াই যে চিরবিদায় হবে, তা কে জানত? আবু হোসেনের বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিরুল ইসলাম ক্ষোভ আর কষ্টে বললেন, ‘দেশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব, এমন দুর্ঘটনা আর যেন কোনো পরিবারকে নিঃস্ব না করে।’

এপ্রিল মাসে উত্তরবঙ্গের এসব গ্রামে কৃষিকাজ কম থাকায় প্রতিবছরই হাজারো শ্রমিক পেঁয়াজ তোলা বা ধান কাটার জন্য ফরিদপুর ও কুমিল্লার দিকে ছোটেন। সামান্য বাড়তি আয়ের আশায় তাঁরা নিজ এলাকা ছেড়ে দূর-দূরান্তে যান। 

বিরামপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কমল কৃষ্ণ রায়ের মতে, এ সময়ে কাজ কম থাকায় প্রায় দুই হাজার শ্রমিক জীবনযুদ্ধে অংশ নিতে ঘর ছাড়েন। কিন্তু এবারের সেই যাত্রাই ভাইগর গ্রামের চারটি পরিবারের জন্য নিয়ে এল চিরস্থায়ী অন্ধকার।

প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর