বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

‘বাবা, অ্যালাও ঘুমাছিস? ওঠেক!’: কফিনবন্দী সোহানকে দেখে মায়ের আর্তনাদ

জেলা প্রতিনিধি, ঠাকুরগাঁও
প্রকাশিত: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০১:২৪ পিএম

শেয়ার করুন:

‘বাবা, অ্যালাও ঘুমাছিস? ওঠেক!’: কফিনবন্দী সোহানকে দেখে মায়ের আর্তনাদ

ছেলের বিদেশ যাওয়ার দিন শাহিনুর আকতার হয়তো অঝোরে কেঁদেছিলেন। সেই কান্না ছিল বিচ্ছেদের, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে ছিল এক বুক আশাও; ছেলে বড় হবে, সচ্ছলতা ফিরবে সংসারে। কিন্তু মাত্র চার মাস না পেরোতেই সেই আশা যে কাঠের কফিনে বন্দি হয়ে ফিরবে, তা কে জানত! দক্ষিণ আফ্রিকায় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়ার পাঁচ দিন পর দেশে এসেছে সোহান হোসেনের (১৮) লাশ। 

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের চিকনমাটি গ্রামের বাড়িতে তার কফিনবন্দী লাশ পৌঁছালে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।


বিজ্ঞাপন


এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে জোহানেসবার্গের কেতলেহং এলাকায় নিজ কর্মস্থলে থাকাকালীন দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সোহান। তার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই একপলকের জন্য ছেলের মুখ দেখার আকুতি জানিয়ে আসছিলেন মা শাহিনুর আকতার। তিনি চেয়েছিলেন শেষবারের মতো ছেলের মুখ দেখতে এবং নিজ হাতে শেষ গোসল করাতে। 

গতকাল বিকেলে কফিনবন্দী লাশটি পৌঁছানোর পর স্বজনদের সহায়তায় শাহিনুরকে সেখানে নেওয়া হয়। নির্বাক হয়ে তিনি কিছুক্ষণ ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে ওঠেন। নিথর ছেলের কপালে হাত রেখে বলে ওঠেন, ‘বাবা, অ্যালাও ঘুমাছিস? ওঠেক!’ মায়ের এই আর্তনাদে উপস্থিত গ্রামবাসী ও স্বজনদের চোখের জল ধরে রাখা দায় হয়ে পড়ে।

পরিবারের সদস্যরা জানান, গত কয়েক দিন ধরে ছেলের লাশের অপেক্ষায় ছিলেন শাহিনুর। না খেয়ে ও না ঘুমিয়ে তিনি শারীরিকভাবে অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছেন। চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি পরিবারের সচ্ছলতার আশায় দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন সোহান। সেখানে জোহানেসবার্গের অদূরে কেতলেহং এলাকায় তার চাচা সিরাজুল ইসলামের মুদিদোকানে কাজ নেন। গত বৃহস্পতিবার রাত ৯টার দিকে দোকান বন্ধের প্রস্তুতির সময় দুর্বৃত্তরা এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালালে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। 

ঘটনার পরদিন এক স্বজনের মাধ্যমে সোহান হাসপাতালে থাকার খবর পেলেও পরে অন্য প্রবাসীদের মাধ্যমে পরিবার নিশ্চিত হয় যে সোহান আর বেঁচে নেই।


বিজ্ঞাপন


গত রোববার স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় মরদেহটি তুর্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে তোলা হয় এবং গতকাল ভোরে তা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। পরে বিকেল ৪টার দিকে লাশটি নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। 

স্থানীয় একটি মাদরাসায় জানাজা শেষে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বাড়ির পাশের কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। সোহানের চাচা মো. মানিক আক্ষেপ করে বলেন, ‘পরিবারের সবাই চেয়েছিল ও লেখাপড়া চালিয়ে যাক, কিন্তু ও বিদেশে যেতে অনড় ছিল। সোহান টাকা পাঠাতে পারেনি, এতে আমাদের কষ্ট নেই; ও বেঁচে ফিরলে সেটাই হতো সবচেয়ে বড় পাওয়া।’ 

ছেলেকে হারিয়ে বিধ্বস্ত বাবা দুলাল হোসেন কেবল এতটুকুই বলতে পেরেছেন, ‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না, শেষবারের মতো ওর মুখটা দেখতে পেরেছি, এতেই আমাদের শান্তি।’

ছেলের মুখটা শেষবারের জন্য একপলক দেখতে পেরেছিলেন সোহানের মা শাহিনুর আকতার।গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রানীশংকৈল উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের চিকনমাটি গ্রামে।

প্রতিনিধি/একেবি

আপডেট পেতে ফলো করুন

Google NewsWhatsAppMessenger
সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর