ধান-চাল সংগ্রহে সাফল্যের খবর দিয়েছে চট্টগ্রামে খাদ্য অধিদপ্তর। তবুও এর মধ্যেই বাজারে বাড়ছে চালের দাম। গত এক সপ্তাহ আগের তুলনায় এখন চট্টগ্রামে পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে চালের দাম প্রতি ৫০ কেজির বস্তায় ২৫০ থেকে ৩৫০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। যা ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
বুধবার (৮ এপৃল) সকালে চট্টগ্রামের পাইকারি চালের বাজার পাহাড়াতলী ও খুচরা পর্যায়ের বিভিন্ন বাজারের চালের ব্যবসায়ীরা এই তথ্য জানিয়েছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়াই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ।
বিজ্ঞাপন
পাহাড়তলী পাইকারি বাজারের আড়তদার লিয়াকত আলী জানান, দিনাজপুর থেকে আগে একটি ট্রাক চাল আনতে খরচ পড়ত ২৫ থেকে ২৭ হাজার টাকা, যা এখন বেড়ে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। যা চালের দামের উপর প্রভাব ফেলেছে।
একইভাবে মদিনা ট্রেডার্সের স্বত্ত্বাধিকারী মোহাম্মদ রোহান বলেন, বাজারে চালের কোনো সংকট নেই। পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। তবে পরিবহন ব্যয় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বাড়ায় চালের দাম বেড়েছে। পরিবহন ব্যয়সহ সামগ্রিক পরিস্থিতিতে চালের দাম আরও বাড়তে পারে।
আড়তদাররা জানান, গত দুই সপ্তাহ আগে ৫০ কেজি ওজনের মিনিকেট চালের যে বস্তা ২ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা বেড়ে ৩ হাজার ২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মানভেদে প্রতি কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।
এছাড়া বেতি আতপ চাল ২ হাজার ৮৫০ টাকা, পাইজাম আতপ ৩ হাজার ১০০ টাকা, স্বর্ণা চাল ২ হাজার ৬০০ টাকা, নুরজাহান ব্রান্ডের চাল ৩ হাজার টাকা এবং জিরাশাইল ৩ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সেদ্ধ চালের মধ্যে মিনিকেট সেদ্ধ ৩ হাজার ১০০ টাকা ও মিনিকেট আতপ ৩ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা সপ্তাহখানেক আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি। দাম বাড়ার প্রভাব পড়েছে খুচরা ক্রেতাদের ওপরও।
বিজ্ঞাপন
নগরীর বহদ্দারহাট বাজারের ক্রেতা ইলিয়াছ হোসেন বলেন, একটার পর একটা জিনিসের দাম বাড়ছে। কিছুদিন আগে থেকে তেলের দাম বাড়তি নেওয়া শুরু করেছে। এখন চালের দামও বাড়াচ্ছে। তেল-চাল দিয়ে যেখানে সবাই নিত্যপণ্যের বাজার শুরু করে, সেখানেই যদি ধাক্কা লাগে তাহলে বাজার করতে এসে আমরা হতাশই হবো।
তিনি বলেন, কাটারি আতপের ২৫ কেজি বস্তা গতমাসে নিয়েছি দুই হাজার ৫০ টাকা দিয়ে। আর এখন নিতে হচ্ছে ২০০ টাকা বাড়তি দিয়ে। বিক্রেতা বলছেন-জ্বালানি
সংকটজনিত পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে চালের দাম বেড়েছে। বিষয়টিতে প্রশাসন মনিটরিং বাড়ালে আমরা একটু স্বস্তি পেতাম।
পাহাড়তলী চাল ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি স্বপন সাহা বলেন, এখন চৈত্র মাস। চাল ওঠা শুরু করেছে। আগের স্টক প্রায় শেষ। এছাড়াও পরিবহন ভাড়া বেড়ে যাওয়ার কারণে চালের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এটি নিয়ে দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই। নতুন চাল আসতে শুরু করেছে। আশা করছি, ১৫-২০ দিনের মধ্যেই দাম কমে আসবে।
অন্যদিকে, ধান-চাল সংগ্রহে সুখবর দিয়েছে চট্টগ্রামের খাদ্য অধিপ্তরের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চট্টগ্রাম অঞ্চলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান-চাল সংগ্রহ করা হয়েছে, যা সংশ্লিষ্টদের কাছে বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থবছরে ধান, সিদ্ধ ও আতপ চাল মিলিয়ে সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৯৫৩ টন। মৌসুম শেষে সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ২৯১ টন, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৯ দশমিক ৮১ শতাংশ।
আগের পাঁচ মৌসুমে যেখানে ধারাবাহিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি, সেখানে এবার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়াকে ইতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছেন কর্মকর্তারা। সরকার নির্ধারিত দামের কারণে কৃষকদের অংশগ্রহণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি মৌসুমে প্রতি কেজি ধানের দাম ৩৪ টাকা, সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা এবং আতপ চাল ৪৯ টাকা নির্ধারণ করা হয়। আগের বছরের তুলনায় ধান ও চালে দাম বাড়ানোয় কৃষকেরা সরকারি গুদামে ধান বিক্রিতে আগ্রহী হয়েছেন।
সরকার গত বছরের ২০ নভেম্বর থেকে এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সংগ্রহ কার্যক্রম পরিচালনা করে। চট্টগ্রাম বিভাগের ৯টি জেলায় এই কার্যক্রম বাস্তবায়িত হয়। শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা কম থাকলেও পরে তা বাড়ানো হয় উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে।
খাতভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ধান সংগ্রহে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। ৬ হাজার ৬৩৭ টন লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ হয়েছে ২১ হাজার ৫১১ টন, যা ৩২৪ শতাংশ। তবে সিদ্ধ ও আতপ চালের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা প্রায় পূরণ হয়েছে। সিদ্ধ চাল সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ৩ হাজার ৪৪৩ টন এবং আতপ চাল ৩৫ হাজার ৩৩৭ টন।
পরিসংখ্যান বলছে, আগের পাঁচ মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছিল খাদ্য অধিদপ্তর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংগ্রহের হার ছিল ৫০ দশমিক ৭৩ শতাংশ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৫৩ দশমিক ৮২ শতাংশ, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩৮ দশমিক ৭২ শতাংশ, ২০২১-২২ অর্থবছরে ৬৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে মাত্র ৫ দশমিক ৯ শতাংশ।
চট্টগ্রামের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক জি. এম. ফারুক হোসেন পাটওয়ারী বলেন, চলতি মৌসুমে ধানের উৎপাদন ভালো হওয়া এবং সরকার নির্ধারিত মূল্য বাজারদরের কাছাকাছি থাকায় কৃষকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধান-চাল সরবরাহ করেছেন। পাশাপাশি সরকার নির্ধারিত দাম বাজারদরের কাছাকাছি থাকায় কৃষকরাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। যা ভবিষ্যতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে চালের বাজারের ভোক্তাদের অস্বস্তি থেকে মুক্তি দিতে পারে।
কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন বাড়লেও আগের বছরগুলোতে কৃষকদের সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় যুক্ত করা কঠিন ছিল। তবে এবার ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় সেই চিত্র বদলেছে। এই ধারা ধরে রাখতে হলে সংগ্রহ প্রক্রিয়া সহজ করা, দ্রুত অর্থ পরিশোধ এবং স্থানীয় মিলমালিকদের আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কৃষি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, চট্টগ্রাম অঞ্চলের ধান-চালের মান উত্তরাঞ্চলের তুলনায় কিছুটা ভিন্ন হলেও নতুন জাত ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহারে উৎপাদন পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে জমির মান, আবহাওয়া ও লবণাক্ততার বিষয় বিবেচনায় নিয়ে মানসম্মত উৎপাদন বাড়াতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
প্রতিনিধি/টিবি

