পিরোজপুরের নাজিরপুরের বাবুরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক স্বাক্ষর জাল করে বিল তোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর এই ঘটনা ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক শংকর কুমার মিস্ত্রি গত ২ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়সহ, বরিশাল বিভাগ কমিশনার, পিরোজপুর জেলা প্রশাসক ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বরাবর লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের সিএ আরাফাত বাবুরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ সমাপ্ত না করে চূড়ান্ত বিলের কাগজ সই চান। এ সময় প্রধান শিক্ষক তাকে ওই ঠিকাদারি কাজটি সম্পূর্ণ করলে চূড়ান্ত বিলে সই দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে কাজটি পড়ে থাকায় প্রধান শিক্ষক খোঁজ নিয়ে জানতে পারে, তার স্বাক্ষর জাল করে করে পুরো টাকা উত্তোলন করেছে উপজেলা চেয়ারম্যান সিএ ইয়াসির আরাফাত।
বিজ্ঞাপন

বাবুর হাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শংকর কুমার মিস্ত্রি জানান, বিদ্যালয়ে কাজ না করে বিল উত্তোলন করায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরে ইয়াসির আরাফাত আমাকে ফোনে হুমকি প্রদান করেন। তিনি আরও জানান, এর আগে বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ সম্পূর্ণ না করে আমার কাছে চূড়ান্ত বিলের সই করাতে আসে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সিএ ইয়াসির আরাফাত। এ সময় আমি তাকে কাজটি সম্পন্ন করে আসতে বলি। পরে দীর্ঘদিন ধরে কাজটি আংশিক অবস্থায় পড়ে থাকার পরে শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, কাজের চূড়ান্ত তুলে নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয় বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মাহফুজুর রহমান ও জেলা প্রশাসক আবু সাইদ লিখিত অভিযোগ প্রাপ্তির বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পিরোজপুর জেলা প্রশাসক আবু সাইদ জানান, এই বিষয় তদন্ত টিম গঠনের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
২০২৩ সালে ২ এপ্রিল লটারি মাধ্যমে বাবুরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়ালের কাজ পান মঠবাড়িয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হাওলাদার ট্রেডিং। আর কাছ থেকে কাজটি কিনে নেন আরাফাত। যার চুক্তি মূল্য ছিল ১৫ লাখ।
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে জেলা শিক্ষা প্রকৌশলী মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ইয়াসির আরাফাত ২০১৪ সাল ধরে ইশতিয়াক কনস্ট্রাকশন নামের একটি লাইসেন্স দিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ ভাগিয়ে নিয়ে তা করান। তবে ওই লাইসেন্সের মূল মালিক সিএ ইয়াসির আরাফাতের বোন জামাই মো. রেজাউল ইসলাম মোল্লা। আর বিলের চেকেও স্বাক্ষরসহ লাইসেন্সটি পরিচালনা করেন আরাফাত নিজেই।। দুলাভাইয়ের নাম ব্যবহার করেন মাত্র।
জানা গেছে, রেজাউল ইসলাম মোল্লা একজন মুরগী খামারি। তিনি জানান, ইশতিয়াক কনস্ট্রাকশন নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালন করেন তার দুই শ্যালক ইয়াসির আরাফাত ও ছাত্রলীগ নেতা রিফাত।
স্থানীয় সাতকাছিমা গ্রামের দিনমজুরের ছেলে মো. ইলিয়াস শেখের ছেলে নাজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সিএ মো. ইয়াসির আরাফাত। ইয়াসির আরাফাত ২০১০ সালে ইউডিসি, ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে (উদ্যোক্তা) হিসাবে নাজিরপুর সদর ইউনিয়ন পরিষদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে তৎকালীন উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম খানের সময়কালে যোগদান করেন তার সিএ পদে। ২০১৪ সালে নাজিরপুর উপজেলা চেয়ারম্যানের সিএ পদে যোগদানের পর থেকে তার বোন জামাই রেজাউল ইসলাম মোল্লার নাম ব্যবহার করে নিজে ঠিকাদারি কাজ শুরু করেন। এর পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে উপজেলা প্রশাসন অধিকাংশ কাজ আরএফকিউ পদ্ধতি করে নিজের বোন জামাইয়ের লাইন্সেস ইশতিয়াক কনস্ট্রাকশন মাধ্যমে নিজে করিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন মাফিয়ার সামরাজ্য। দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে হয়েছেন অঢেল সম্পদের মালিক। গড়ে তুলেছেন আলিশান বাড়ি, ব্যবহার করেন ৫ লক্ষ টাকার দুইটি মোটর সাইকেল। বর্তমানে এই লাইন্সসে অধীনে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় কয়েক কোটি টাকার কাজ চলমান। আর এই সব কাজ অফিস চলাকালীন সময়ে সরকারি কাজ ফাঁকি দিয়ে তদারকি করেন বলে একাধিক ঠিকাদার জানান।

পিরোজপুর চেম্বার অফ কমার্সের পরিচালক ও শরীফ ট্রেট ইন্টারন্যাশনাল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক মিজানুর রহমান জানান, স্থানীয় বাসিন্দা হয়ে দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকায় চাকরির সুবাদে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চেয়ারম্যান ও নির্বাহী কর্মকর্তা ম্যানেজ করে প্রশাসনের ভিতরে প্রভাবশালী হয়ে উঠছে। যার ফলে গত ১২ বছরে তিনি জাইকা প্রকল্প, এডিপি ও রাজস্ব খাত থেকে ব্যাপক প্রকল্প ভাগিয়ে নিয়ে নিয়েছেন। আর এই সব প্রকল্পের কাজ কোনোটা কাজ করে আবার কোনোটা কাজ না করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে পিরোজপুর জেলা প্রশাসক আবু সাইদ জানান, সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় অনুমতি ছাড়া অন্য কোনো পেশায় কাজ করার সুযোগ নেই। যে অনিয়মের অভিযোগের রয়েছে। যার তদন্ত চলমান রয়েছে।
গত বছর স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়নের মন্ত্রণালয়, একাউন্টস অফিসার নুরে আলম নেতৃত্বে একটি অডিট টিম নাজিরপুর উপজেলা পরিষদে অডিটে এসে ওর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ পান। টিম লিডার নুরে আলম জানান, নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের সিএ ইয়াসির আরাফাত নাজিরপুর সদরে অবস্থিত পাকমঞ্জীল মাদরাসা ও শাখারীকাঠী বৈরাগী এলাকায় প্রজেক্ট দেখিয়ে কাজ না করে বিল উত্তোলন করেছেন। এছাড়া নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের ভবন সংস্কার, উপজেলা ডরমেটরি ভবন সংস্কার ও উপজেলা পরিষদের মধ্যে রাস্তা সংস্কারে কাজ নামকে ওয়াস্তে করে ৪০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অডিট টিম তথ্য পেয়েছেন। এবং এই সব অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হয়েছে।
নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের সিএ ইয়াসির আরাফাত বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, বাবুরহাট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফোন নাম্বার আমার কাছে নেই। আমি কোনো ঠিকাদারি কাজের সঙ্গে জড়িত না।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া শাহানাজ তমাকে দফায় দফায় ফোন করা হলে এবং খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো সাক্ষাৎকার পাওয়া যায়নি।
প্রতিনিধি/এসএস

