দীর্ঘ ১৬ বছরের গবেষণায় জ্বালানি সাশ্রয়ী একটি জেনারেটর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন ফেনীর যুবক আবদুল হান্নান। তাঁর দাবি, এই পদ্ধতিতে জেনারেটর চালালে দেশে প্রচলিত জ্বালানি ব্যবহারের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ সাশ্রয় সম্ভব। ইতোমধ্যে উদ্ভাবনটি শিল্প মন্ত্রণালয়ের স্বীকৃতি পেয়েছে এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষিত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে এই উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে আর্থিক সংকটে প্রয়োজনীয় পরিসরে গবেষণা এগিয়ে নিতে না পেরে হতাশায় রয়েছেন উদ্ভাবক। সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রচলিত পদ্ধতিতে জ্বালানি ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য অপচয় হয়। আবদুল হান্নানের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে সেই অপচয় প্রায় ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। বৈশ্বিক বিভিন্ন সংঘাতের কারণে জ্বালানি সংকট তীব্র হওয়ায় তাঁর প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা গেলে তা দেশ-বিদেশে জ্বালানি সাশ্রয়ে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
দেশে বিভিন্ন ছোট-বড় শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও গ্যাসচালিত জেনারেটরে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হলে বছরে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি সাশ্রয় হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে এই উদ্ভাবন নিয়ে উচ্চতর গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ, যন্ত্রপাতি, গবেষণাগার ও প্রযুক্তিগত সহায়তা তাঁর নেই বলে জানান আবদুল হান্নান।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের চলতি বছরের ৯ মার্চ প্রকাশিত এক প্রজ্ঞাপনে তাঁর উদ্ভাবন স্বীকৃতি পায়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এটি একটি উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা। পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাস ও স্টিম ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন ধরনের জেনারেটরের সঙ্গে এটি ব্যবহারযোগ্য। সিনক্রোনাস জেনারেটর, অল্টারনেটর ও পার্মানেন্ট ম্যাগনেট জেনারেটরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এই পদ্ধতি জ্বালানি সাশ্রয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগ এ প্রযুক্তি যাচাই করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪৮৩ গ্রাম জ্বালানি প্রয়োজন হয়। অন্যদিকে হান্নানের পদ্ধতিতে একই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনে লাগে ৩৫৭ গ্রাম জ্বালানি। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে ১২৬ গ্রাম জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব।
ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের ধোনসাদ্দা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হান্নান। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া তিনি ২০০০ সালে এসএসসি পাসের পর জীবিকার তাগিদে কাজে নামেন। পরে স্থানীয় ধোনসাদ্দা বাজারে একটি কম্পিউটার ও জেনারেটর সার্ভিসের দোকান দেন। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও বাড়তি জ্বালানি খরচের কারণে ব্যবসায় সংকট দেখা দিলে জ্বালানি সাশ্রয়ের উপায় খুঁজতে শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই তাঁর উদ্ভাবনী যাত্রা শুরু। দীর্ঘ চেষ্টার পর ২০২৫ সালের শেষ দিকে তিনি এই পদ্ধতি উদ্ভাবনে সফল হন।

আবদুল হান্নান বলেন, শুরুতে জেনারেটরের বিভিন্ন অল্টারনেটর তৈরি করে পরীক্ষা চালান। ধাপে ধাপে ১০০, ২০০ ও ৫০০ ওয়াট ক্ষমতায় পরীক্ষা শেষে ডিজেল জেনারেটরে তা প্রয়োগ করেন। কয়েকটি সেটআপ তৈরি করে তিনি জ্বালানি সাশ্রয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত হন।
তিনি আরও জানান, এই কাজ করতে গিয়ে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি। নিজের উদ্যোগে অনলাইনে পড়াশোনা করে ইলেকট্রিক, ইলেকট্রনিকস ও ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। বর্তমানে এই প্রযুক্তিকে বড় পরিসরে নিয়ে যেতে সরকারি বা বেসরকারি সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা আছে। বিস্তারিত যাচাই করে উদ্ভাবনের যৌক্তিকতা বিবেচনা করে এটি রাষ্ট্রীয়ভাবে কাজে লাগানো যায় কি না, তা দেখা হবে।
এআর

