শনিবার, ৪ এপ্রিল, ২০২৬, ঢাকা

এলাকায় মাইকিং

‘সাউন্ডবক্স বাজালে কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না’

জেলা প্রতিনিধি, কুষ্টিয়া 
প্রকাশিত: ০৪ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:১৯ পিএম

শেয়ার করুন:

‘সাউন্ডবক্স বাজালে কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না’

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহ ইউনিয়নের বড় মাজগ্রামে সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট (গান বাজনা) নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেনে ও না জেনে কেউ সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট বাজালে তাদেরকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হবে। এমনকি তাদেরকে কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবে না।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) দিনব্যাপী প্রচার মাইকের মাধ্যমে এলাকায় এমন ঘোষণা দেন বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদ কমিটি। তবে এতে ক্ষুব্ধ গ্রামটির একাংশ মানুষ।


বিজ্ঞাপন


মসজিদের ইমাম ও খতিব মাওলানা ওয়ালীউল্লাহ ফরিদী বলেন, গত ২৭ মার্চ শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে মসজিদ কমিটি আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন যে, বড় মাজগ্রাম মহল্লার অধীনে কোনো বাড়িতে সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট বাজানো হলে ঈদগাহ, মসজিদ ও কবরস্থানের সকল কার্যকলাপ থেকে তাদেরকে বহিষ্কার করা হবে। অর্থাৎ তাদের থেকে মসজিদে মসটি (চাল) নেওয়া হবে না। কবরস্থান তাকে দাফন করতে দেওয়া হবে না। এক কথায় সামাজিকভাবে তাদেরকে বয়কট করা হবে।

তার ভাষ্য, কোরআনে গানবাজনা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবুও সম্প্রতি কিছু বিয়ে - সন্নতে খতনা বাড়িতে উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স বাজানো হয়েছে। এতে অসুস্থ মানুষসহ সকলের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হওয়ায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মসজিদ কমিটির কোষাধ্যক্ষ কুরবান আলী বলেন, বিয়ে ও সুন্নতে খতনা বাড়ির উচ্চ শব্দের জন্য যেন নামাজ পড়া, কোরআন তেলাওয়াত করা এবং অসুস্থ মানুষের সমস্যা না হয়। সে জন্য সবাই মিলে ঢপ (সাউন্ড বক্স) বাজানো নিষেধ করা হয়েছে। তাছাড়াও একটি নির্দিষ্ট স্থানে প্যান্ডেল করে অনুষ্ঠান করতে কোনো বাঁধা নেই। 

জানা গেছে, মসজিদ থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে জমারত আলী ও রুপা খাতুন দম্পতির বাড়ি। তাদের এতিম নাতি ছেলে আলিফের(৭) শখ মিটাতে খতনা অনুষ্ঠানে ঈদের পরের বৃহস্পতিবার বাড়িতে সাউন্ড বক্স বাজিয়ে আনন্দ উল্লাস করেছিলেন। এতে মুসল্লিরা অস্বস্তি বোধ করলে সাউন্ড বক্স বাজানো বন্ধ করে দেন। এনিয়ে তর্কাতর্কি ও উত্তেজনার ঘটনা ঘটলে পরদিন শুক্রবার আলোচনা সাপেক্ষে গ্রামে মাইক ও সাউন্ড বক্স বাজানো বন্ধের সিদ্ধান্ত নেন। 


বিজ্ঞাপন


এ বিষয়ে অভিযোগ অস্বীকার করে রুপা খাতুন বলেন, নাতি ছেলের শখ পূরণ করতে খতনা অনুষ্ঠানে মাত্র একদিন বক্স বাজানো হয়েছে। তবে নামাজ ও আজানের সময় বন্ধ ছিল। সব সময় সাউন্ডও কম থাকত। তবুও শত্রুতা করে মসজিদ কমিটির কিছু লোক প্রভাব দেখিয়ে গ্রামে ঝৈ-ঝামেলা করছে। তার ভাষ্য, বন্ধ হলে সারাদেশেও বন্ধ হোক। শুধু এখানে কেন?

এদিকে, বৃহস্পতিবার দুপুরে বড় মাজগ্রামের মাইকিংয়ে প্রচার করার করার ৩১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর থেকে এনিয়ে ব্যাপক আলোচনা - সমালোচনা সৃষ্টি হয়।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি জানায়, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী এভাবে গানবাজনা নিষিদ্ধ করার সুযোগ নেই। কেউ সাউন্ড বক্স ও মাইকসেট অতিরিক্ত শব্দে বাজালে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সচেতন করা যেতে পারে। অথবা প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে পারে। তবে এভাবে মাইকিং করে বন্ধ করা ঠিক নয়।

এটাকে বাড়াবাড়ি আখ্যা দিয়ে কুমারখালীর সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি ও নাট্যকার লিটন আব্বাস বলেন, প্রতিটা মানুষ স্বাধীন। আমরা কারও ওপর কিছু চাপিয়ে দিতে পারি না। এটা বন্ধ করার আইন - ইখতেয়ার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই। প্রত্যেকটা ব্যক্তির ধর্মীয় অনুভূতির পাশাপাশি নিজস্ব চেতনা আছে। এটা সৃষ্টির শুরু থেকেই আছে। সুতরাং বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

অভিযোগ অস্বীকার করে বড় মাজগ্রাম জামে মসজিদের সভাপতি আমির হোসেন বলেন, সব ধরনের গানবাজনা বন্ধ বিষয়টি ঠিক ওরকম নয়। উচ্চ শব্দে সাউন্ড বক্স ও মাইক বাজানো বন্ধের বিষয়ে সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মাইকিংয়ে কি প্রচার হয়েছে তা তিনি জানেন না।

দেশের প্রচলিত আইনে এভাবে গানবাজনা বন্ধ করার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। আর জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন হাসান বলেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, শিলাইদহ বড় মাজগ্রামের ঘটনাটি আমি অবগত আছি। এ বিষয়ে আমার উপজেলা প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছি। তারা উপজেলা প্রশাসন মসজিদ কমিটির সাথে কথা বলে একটি মুচলেকা নিয়েছে। ভবিষ্যতে আর এ ধরনের কোনো কাজ তারা করবে না।

প্রতিনিধি/ এজে

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর