তেল নেওয়ার জন্য অকটেন ও পেট্রোল সরবরাহের মেশিনের সামনে এসে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন মোটরসাইকেল চালকেরা। কিন্তু পাম্পের কর্মীরা বলছেন, ‘অকটেন নেই।’ কেউ কেউ পাশের পাম্পের দিকে চলে যাচ্ছেন। কেউ আবার বাধ্য হয়ে পেট্রোল নিচ্ছেন। চাহিদা বেশি থাকলেও ২০০ টাকার বেশি পেট্রোল দেওয়া হচ্ছে না। এছাড়া ডিজেল নিতে কৃষকদের লম্বা লাইন ছিল চোখে পড়ার মত।
বুধবার (২৭ মার্চ) বিকেলে লোহাগড়া উপজেলার কালনা-নড়াইল-যশোর মহাসড়কের বসুপটি এলাকার আলম ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায় এমন চিত্র।
বিজ্ঞাপন
এখানে মোটরসাইকেল চালক সাজ্জাদ খান বলেন, গাড়িতে তেল নেওয়া এখন মানুষের জীবনযুদ্ধের একটি অংশ হয়ে গেছে। মানুষের এখন গাড়িতে তেল নেওয়ার জন্যও হাতে তিন-চার ঘণ্টার একটা সময় নিয়ে বের হতে হচ্ছে। আমরা সবাই তো বুঝি যুদ্ধের কারণে তেল সংকট, এখানে সরকারেরও কিছু করার নেই।

পাম্পের এক কর্মী বলেন, আমাদের পাম্পে পর্যাপ্ত তেল ছিল। জনগণ অতিরিক্ত তেল নিয়েই সংকট তৈরি করছে। অকটেন নেই তবে কিছু পেট্রোল ও ডিজেল দিয়ে পাম্প চলতেছে।
তবে জ্বালানি তেল মজুতের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পাম্পসংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় কম তেল আসা ও ক্রেতাদের বাড়তি চাপ থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। ডিপো থেকে তেল আসার পর যতক্ষণ মজুত থাকে, ততক্ষণই ক্রেতাদের দেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে, বোরো মৌসুমে সেচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ডিজেল সংকট নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন নড়াইলের প্রান্তিক কৃষকরা। স্থানীয় বাজারে চাহিদামতো ডিজেল না পাওয়ায় সময়মতো জমিতে পানি দেওয়া নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার কাশিপুর গ্রামের কৃষক আইনুদ্দিন মন্ডল এবার তিন একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছেন। জমিতে সেচ দিতে তিনি ডিজেল চালিত শ্যালো মেশিন ব্যবহার করেন। অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর ধানের চারা ভালো হলেও সময় মতো পানি দিতে না পারায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
শুক্রবার (৭ মার্চ) দুপুরে এক লিটার তেল নিয়ে নিজের জমিতে পানি দিতে মাঠে এসেছেন কৃষক রাফি আহমেদ। তিনি বলেন, এক লাখ টাকা লোন করে এবছর তিন একর জমিতে বোরো ধান লাগাইছি। এহন জমিতে টানের সময়, পানির খুব দরকার। দোহান দোহান ঘুরেও ডিজেল পাচ্ছি না। খালি বোতল নিয়ে বাড়ি ফিরতি হয়। পানির অভাবে জমির গাছের গোড়ায় মাটি শুকাইয়া গেছে, গাছে লালভাব ধরছে। খুব দুশ্চিন্তায় আছি।

নড়াইল জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষক একই সমস্যায় পড়েছে। স্থানীয় বাজারে ডিজেল না পেয়ে অনেকেই ছুটে যাচ্ছেন পাম্পে। সেখানে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
কৃষক রহিম আলি বলেন, সহাল বেলা তেল কিনতি গিছি, কচ্চে তেল নেই। তেলের কোনো লাইন নেই। এভাবে চললে ব্লক আমাদের মার যাবে। এহন যদি ব্লক মার যায়, সারা বছর খাবো কি? অনেক দোকানে তেল রয়েছে, কিন্তু তেল বিক্রি করে না।
কৃষকেরা জানান, স্থানীয় বাজারে প্রতি লিটার ডিজেল ১০৫ টাকায় পাওয়া যেত। এখন তা ১১০ থেকে ১১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোথাও কোথাও এর চেয়ে বেশি দাম ও নেওয়া হচ্ছে।
আড়পাড়া গ্রামের কৃষক মিলন শেখ বলেন, বাজারে তেল নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। দুই-তিন দিন ঘুরে একদিন তেল পাওয়া যায়। আগে যে দাম ছিল, এখন তার চেয়ে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে। এখন ধানের জমিতে নিয়মিত পানি দিতে না পারলে ভালো ফলন পাওয়া যাবে না।

নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, জেলায় এ বছর পাঁচ হাজর ৩০৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে, যা থেকে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৬২৩ মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নড়াইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান বলেন, আমাদের উপসহকারী কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে কাজ করছেন। সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া উপজেলায় ইতোমধ্যে দোকান পরিদর্শন করা হচ্ছে। কেউ বেশি দামে ডিজেল বিক্রি করলে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি/টিবি

