রাজবাড়ী জেলাজুড়ে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে জেলার ফিলিং স্টেশনগুলোতে পেট্রোল ও অকটেন সরবরাহ সীমিত থাকায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যানবাহন চালকেরা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের দীর্ঘ লাইন ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা এখন রাজবাড়ীর পাম্পগুলোর নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাজবাড়ী সদর উপজেলার শ্রীপুরে অবস্থিত ‘রাজবাড়ী ফিলিং স্টেশন’ ও ‘মেসার্স পলাশ ফিলিং স্টেশন’ ঘুরে দেখা যায়, সকাল থেকেই শত শত মোটরসাইকেল চালক তেলের জন্য ভিড় করছেন। তীব্র রোদ উপেক্ষা করে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও কাঙ্ক্ষিত তেল না পেয়ে অনেককেই হতাশ হয়ে ফিরে যেতে দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
পাম্প কর্তৃপক্ষ বলছে, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় অনেক কম তেল সরবরাহ করায় তারা গ্রাহকদের চাহিদা মেটাতে পারছেন না।

ভোগান্তির মাঝে নতুন মাত্রা যোগ করেছে অব্যবস্থাপনা। অভিযোগ উঠেছে, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা চালকদের তোয়াক্কা না করে অনেক পাম্পে প্রভাব খাটিয়ে বা গোপনে বোতলে করে তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। এর প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ মোটরবাইক চালকেরা পাম্প চত্বরে সমবেতভাবে দীর্ঘক্ষণ মোটরসাইকেলের হর্ন বাজিয়ে এক অভিনব প্রতিবাদ জানান। তাদের দাবি, পাম্পে মজুদ থাকলেও সাধারণ চালকদের হয়রানি করা হচ্ছে এবং তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে যারা কর্মস্থলে ফিরছেন তারা পড়েছেন সবথেকে বেশি বিপাকে।
বিজ্ঞাপন
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এক মোটরসাইকেল আরোহী মোঃ শিমুল পারভেজ টিটুল বলেন, ‘সকাল থেকে রাজবাড়ীর তিনটি পাম্প ঘুরলাম, কোথাও তেল নেই। তীব্র রোদে দাঁড়িয়ে থাকাই এখন দায় হয়ে পড়েছে। অনেক পাম্পের প্রবেশপথে তেল নেই লেখা সংবলিত বোর্ড বা রশি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে দূরপাল্লার যাত্রীদের যাত্রা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।’

বাইক চালক মো. আসলাম বলেন,’আমার ছোট ভাইটা রাজবাড়ী সদর হাসপাতালে ছটফট করছে। ডাক্তার জরুরি ভিত্তিতে ওষুধ আনতে বলেছে, অথচ আমার বাইকে এক ফোঁটা তেল নেই। শ্রীপুর পাম্পে এসে দুই ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। তপ্ত রোদে মাথা ঘুরছে, কিন্তু ভাইটার মুখ মনে পড়লে চোখে পানি চলে আসছে। পাম্পের লোকজন সিরিয়াল মানছে না, অথচ আমার কাছে প্রতিটা সেকেন্ড জীবনের সমান। তেল পাব কি পাব না জানি না, কিন্তু এই দেরিটা হয়তো আমার ভাইয়ের বড় কোনো ক্ষতি করে দেবে।’
কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী বাইক চালক রহিম সেখ বলেন, ‘ঈদের ছুটি শেষে কত আনন্দ নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম। কুষ্টিয়া থেকে আসছি, গন্তব্য ঢাকা। রাজবাড়ীতে এসে দেখি সব পাম্পে রশি টাঙানো। মেসার্স পলাশ ফিলিং স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষায় আছি। ।এই রোদে পুড়ে গায়ের চামড়া ফেটে যাচ্ছে, পিপাসায় বুক শুকিয়ে কাঠ। অথচ তেলের দেখা নেই। ঈদের আনন্দটা এভাবে বিষাদে পরিণত হবে ভাবিনি।’

স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা স্বামী শামীম আহমেদ বলেন, ‘বিয়ের পর প্রথমবার স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার কথা। সকাল থেকে রেডি হয়ে বের হয়েছি, কিন্তু তেলের জন্য এই পাম্পে আটকে আছি তিন ঘণ্টা। রোদের তাপে আমার স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়ছে, অথচ সিরিয়াল এক ইঞ্চিও নড়ছে না। আনন্দ নিয়ে বের হয়ে এখন অপমানে আর কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। তেল না পেয়ে শেষমেশ হয়তো বাইক ঠেলে বা রিকশায় করে ফিরে যেতে হবে। এই ভোগান্তির বিচার কে করবে?’
আত্মীয়র বাড়িতে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা তপ্ত রোদে ক্লান্ত যাত্রী মো. হাবিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুরের মধুখালীতে আত্মীয়র বাড়ি যাওয়ার জন্য সকাল সকাল বের হয়েছিলাম। সাথে কিছু উপহার আর অনেক আনন্দ ছিল। কিন্তু শ্রীপুর পাম্পে এসে গত ১ ঘণ্টা ধরে এই আগুনের মতো রোদে পুড়ে দাঁড়িয়ে আছি। শরীর আর চলছে না। আত্মীয়রা বারবার ফোন করে জিজ্ঞেস করছে কোথায় আছি, কিন্তু লজ্জায় বলতে পারছি না যে এক লিটার তেলের জন্য রাস্তার মাঝখানে আটকে আছি। চোখের সামনে দেখছি অনেকে সিরিয়াল ভেঙে বোতলে তেল নিয়ে যাচ্ছে, আর আমরা সাধারণ মানুষ রোদে পুড়ে মরছি। জানি না আজ আদৌ মধুখালী পৌঁছাতে পারব কি না, নাকি এই পাম্পেই দিন পার হয়ে যাবে।’

রাজবাড়ী ফিলিং স্টেশনের ক্যাশিয়ার মোঃ হাফিজুল ইসলাম মিলেন বলেন, ‘ডিপো থেকে সরবরাহ কম থাকায় আমরা হিমশিম খাচ্ছি। আমাদের ওপর প্রচণ্ড চাপ। যতক্ষণ স্টকে তেল আছে, আমরা নিয়ম মেনেই দেব। তেল শেষ হয়ে গেলে আমাদের আর কিছু করার থাকবে না।’
তীব্র রোদ আর তেলের সংকটে রাজবাড়ীর সাধারণ মানুষের জনজীবন এখন বিপর্যস্ত। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই ভোগান্তি আরও প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদের ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেল সরবরাহে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল, তবে বর্তমানে সরবরাহ স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া চলছে।
রাজবাড়ী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নেজারত ডেপুটি কালেক্টর (এনডিসি) মো. হাফিজুর রহমান জানান, তেল নিয়ে যেন কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি না হয় সে লক্ষ্যে নিয়মিত তদারকি ও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে ।

