মঙ্গলবার, ২৪ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

বদলি-পদায়নের ঘূর্ণিতে হাতিয়া: টেস্ট গিনিপিগ নয়, চাই অভিজ্ঞ ক্যাডার

ছায়েদ আহামেদ, হাতিয়া (নোয়াখালী)
প্রকাশিত: ২৪ মার্চ ২০২৬, ০৪:২৪ এএম

শেয়ার করুন:

বদলি-পদায়নের ঘূর্ণিতে হাতিয়া: টেস্ট গিনিপিগ নয়, চাই অভিজ্ঞ ক্যাডার

দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় প্রশাসনিক শূন্যতা যেন দীর্ঘদিনের এক নীরব বাস্তবতা। গুরুত্বপূর্ণ একাধিক দপ্তরে পদ শূন্য থাকায় জনসেবায় ভোগান্তি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এখানে প্রায়ই নতুন ও অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন করা হয়—যেন এটি কোনো পরীক্ষাগার। কিন্তু সচেতন মহলের প্রশ্ন, লাখো মানুষের বসবাসের এই জনপদ কি আদৌ কোনো ‘টেস্ট গিনিপিগ’ হতে পারে?

প্রায় ২১শ’ বর্গমাইল আয়তনের হাতিয়ায় বসবাস করে সাড়ে ছয় লাখের বেশি মানুষ। ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলে প্রশাসনের সামান্য শূন্যতাও জনজীবনে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। অথচ বাস্তবতা হলো—কখনো ইউএনও নেই, কখনো সহকারী কমিশনার (ভূমি) নেই, আবার কখনো চিকিৎসক বা মৎস্য কর্মকর্তার অভাব; এ এক চক্রাকারে ঘুরতে থাকা সংকট।


বিজ্ঞাপন


স্থানীয়দের অভিজ্ঞতায় এই সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। বুড়িরচরের বাসিন্দা কাশেম জানান, এসিল্যান্ড না থাকায় তার জমি সংক্রান্ত মামলার শুনানি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে।

পৌর এলাকার আলতাফ ও জেসমিন বলেন, পৌর প্রশাসক না থাকায় নাগরিক সনদ কিংবা জন্মনিবন্ধনের মতো মৌলিক সেবাও মাসের পর মাস আটকে থাকে।

প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা শুধু ভূমি বা পৌরসেবায় সীমাবদ্ধ নয়। মৎস্য বিভাগে দীর্ঘদিন কর্মকর্তা না থাকায় সামুদ্রিক অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। গত বছরের ২৯ অক্টোবর কর্মকর্তা বদলির পর এখনো নতুন কেউ যোগ দেননি; পাশের উপজেলা থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। একইভাবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ ২০২৩ সাল থেকে শূন্য, ফলে শিক্ষা প্রশাসনেও স্থবিরতা স্পষ্ট।

সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদেও একই চিত্র। নতুন কর্মকর্তা যোগ দিলেও অল্পদিনের মধ্যে প্রশিক্ষণে চলে যাওয়ায় কার্যক্রম আবার থমকে যায়। এ অবস্থায় ইউএনওকে একাধিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সেবাপ্রার্থীদের ওপর।


বিজ্ঞাপন


সম্প্রতি হাতিয়ার প্রশাসনিক পরিস্থিতি আরও আলোচনায় আসে সাবেক ইউএনও মো. আলাউদ্দিনকে ঘিরে বিতর্কের পর। কয়েকদিনের প্রশাসনিক শূন্যতায় জনসেবা কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। পরে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টন করা হলেও এই ঘটনা প্রমাণ করে—একটি গুরুত্বপূর্ণ উপজেলায় প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা কতটা জরুরি।

এরই মধ্যে নতুন করে কর্মকর্তাদের পদায়ন ও বদলির প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করলেই কি দায়িত্ব শেষ, নাকি বাস্তবে কার্যকর উপস্থিতি নিশ্চিত করাই আসল চ্যালেঞ্জ?

জনগুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, হাতিয়ার মতো বৃহৎ ও জনবহুল উপজেলাকে ‘কাজ শেখার জায়গা’ হিসেবে দেখা উচিত নয়; এখানে প্রয়োজন অভিজ্ঞ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের। একই সুর শিক্ষাবিদ ও সচেতন মহলের কণ্ঠেও—তাদের মতে, এই অঞ্চলে পরীক্ষামূলক পদায়নের সুযোগ নেই; বরং জরুরি ভিত্তিতে অভিজ্ঞ প্রশাসক ও চিকিৎসক নিয়োগ দিতে হবে।

‘সচেতন নাগরিক সমাজ-হাতিয়া’র সদস্য আমিরুল ইসলাম বলেন, মেইনল্যান্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই উপজেলায় রিপ্লেসমেন্ট ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ পদ ফাঁকা রাখা উচিত নয়।

একইভাবে সাংবাদিক-লেখক এম দিলদার উদ্দিনের মতে, এত বড় একটি জনপদকে নতুন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা অনুচিত; এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষ।

শিক্ষাবিদদের ভাষ্যও একই রকম। সাবেক অধ্যক্ষ মো. এনামুল হক বলেন, হাতিয়া এখন আর প্রান্তিক কোনো জনপদ নয়; এটি জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যেখানে অভিজ্ঞ প্রশাসক ও চিকিৎসক অপরিহার্য। প্রফেসর তোফায়েল হোসেনের কথায়, “হাতিয়া ক্যাডার সার্ভিসের টেস্ট গিনিপিগ নয়—এখানে শেখার নয়, কাজ করার মানুষ দরকার।”

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব মুহাম্মদ আব্দুস সালাম অবশ্য মনে করেন, দক্ষতা থাকলে একজন কর্মকর্তা একাধিক দায়িত্ব সামলাতে পারেন। তবে তিনিও স্বীকার করেন, হাতিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পদায়ন এবং সময়মতো রিপ্লেসমেন্ট নিশ্চিত করা জরুরি।

স্থানীয়দের দাবি, প্রজ্ঞাপন জারি করলেই দায়িত্ব শেষ নয়; বাস্তবে যেন কোনো পদ খালি না থাকে তা নিশ্চিত করতে হবে। কেননা- হাতিয়া কোনো পরীক্ষাগার নয়, এখানে মানুষের জীবন ও সেবার প্রশ্ন জড়িত।

/এএস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর