মাদারীপুরে নারীদের টার্গেট করে সক্রিয়, শয়তানের নিশ্বাস বা ডেভিলস্ ব্রেথ চক্র। মুহূর্তেই ইচ্ছাশক্তি লোপ করে সঙ্গে থাকা স্বর্ণালংকার, নগদ টাকা সবকিছু নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। গত একমাসে ১০টির বেশি ঘটনা ঘটলেও গ্রেফতার হয়নি কেউ। এতে বাড়ছে আতঙ্ক, এমন পরিস্থিতিতে জনসমাগম এড়িয়ে চলার কথা বলছে জেলা প্রশাসন। আর পুলিশের দাবি, শিগ্গিরই ধরা পড়বে অপরাধী।
শুক্রবার (২০ মার্চ) কথা হয় মাদারীপুরের চরমুগরিয়া এলাকার বাসিন্দা সাবিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি জানান, গত ৪ মার্চ দুপুরে বাজারে যাওয়ার পথে এক তরুণ নাকের কাছে চেতনানাশক পাউডার দিয়ে তার ইচ্ছাশক্তি লোপ করে। পরে তাকে নিয়ে যায় একটি বিদ্যালয়ের মাঠে। গৃহবধূর শরীরে থাকা স্বর্ণের কানের দুল, আংটি, নগদ টাকা নিয়ে মুহূর্তেই লাপাত্তা চক্রের সদস্যরা।
বিজ্ঞাপন

এদিকে একইভাবে শয়তানের নিশ্বাস ব্যবহারের এই কৌশলে খাটিয়ে মধ্য খাগদী এলাকার নুরুনাহার বেগমকে বশ করে দুষ্কৃতিকারীরা। নির্জন এলাকায় নিয়ে তার কাছ থেকেও সবকিছু নিয়ে সটকে পড়ে গ্যাংয়ের সদস্যরা। নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিক বিদ্বিক ঘোরাঘুরি করে তিন ঘণ্টা পর বাড়িতে ফিরে আসেন তিনি। এখনো কাটেনি অসুস্থতা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শহরের পুরাতন বাজার, রাজৈরের টেকেরহাট বন্দরে এই চক্রটির ফাঁদে পড়েছেন অনেকেই। ব্যাংকে আসা গ্রাহক কিংবা নারীদের টার্গেট করে সক্রিয় শয়তানের নিশ্বাস চক্রটি। গত এক মাসে এমন ঘটনার শিকার অন্তত ১০ জন। কয়েকজন শনাক্ত হলেও গ্রেফতার হয়নি কেউ। এতে জনমনে বাড়ছে আতঙ্ক।
বিজ্ঞাপন

তথ্য বলছে, শয়তানের নিশ্বাস এই কেমিক্যালটি অপারেশনের পর রোগীর ব্যথা কমাতে অতি অল্প মাত্রায় ব্যবহৃত হলেও, অপরাধীরা মানুষের মুখের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে করছে প্রতারণা। ১৮-২২ বছর বয়সি একদল তরুণ এমন অপরাধের সাথে জড়িত বলে জানা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে একা চলাচল করতে সতর্কতা অবলম্বনের কথা বলছে জেলা প্রশাসন। পুলিশের দাবি, সক্রিয় চক্রকে ধরতে একাধিক স্থানে কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা।

আরও পড়ুন
ভুক্তভোগী সাবিয়া বেগম বলেন, আমার মাথায় হাত দিয়ে এক তরুণ ছেলে দোয়া চাইল। এরপর চরমুগরিয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে নিয়ে আমাকে তাদের আয়ত্তে নিয়ে নেয়। শরীর থেকে আমার স্বর্ণালংকার ও ব্যাগে থাকা টাকা নিয়ে গেলেও আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছি কারণ তখন ওই চক্রের নিয়ন্ত্রণে ছিলাম আমি। তিন ঘণ্টা পর আমি বাসায় ফিরে আসি। এই ভয়ানক চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় এনে কঠিন বিচার হওয়া উচিত।’

আরেক ভুক্তভোগী নুরুনাহার বেগম বলেন, ‘নাকের সামনে পাউডার জাতীয় চেতনানাশক দিয়ে আমার ইচ্ছাশক্তি লোপ করে। পরে ঈদগাহ্ মাঠে নিয়ে যায় চক্রের সদস্যরা। এরপর সবকিছু নিয়ে লাপাত্তা তারা। আমি এক সপ্তাহ ধরে এখনো অসুস্থ। তাদের এই চেতনানাশকের কারণে ঠিক মতো মাথা দাঁড় করাতে পারি না। আমি আইনের কাছে এই চক্রের বিচার চাই। যাতে অন্যকেউ আমার মতো ক্ষতিগ্রস্ত আর না হয়।’

স্থানীয় বাসিন্দা সায়েম ব্যাপারী বলেন, ‘শয়তানের নিশ্বাস চক্রটি বেশ বেপরোয়া। এখনই তাদের না থামানো গেলে ক্যান্সারের মতো চারদিকে তারা ছড়িয়ে পড়বে। আমরা চাই পুলিশ-প্রশাসন এই চক্রকে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুক। যাতে অন্যকেউ আর এমন ফাঁদে পড়তে না পারে।’

মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ জাহাঙ্গীর আলম, ‘ শয়তানের নিশ্বাস মাদারীপুরে বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এই চক্রকে ধরতে বাসস্ট্যান্ড, হাটবাজার, শপিংমল এলাকায় কাজ করছে পুলিশ। সাদা পোশাকের পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। শিগ্গিরই অপরাধীরা আইনের হাতে ধরা পড়বে।’
মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক জাহাঙ্গীর আলম জানান, এই ভয়ানক চক্রের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রথমত জনসমাগম এড়িয়ে থাকতে হবে। পাশাপাশি রাস্তায় একা চলাচল না করাই উত্তম। এ ব্যাপারে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সন্দেহভাজন কাউকে দেখতে নিকটস্থ থানায় খবর দিতে হবে। জেলা প্রশাসন থেকে পুলিশকে আরও তৎপরত হওয়ার জন্য অনুরোধ করা হবে।
প্রতিনিধি/এসএস

