শুক্রবার, ২০ মার্চ, ২০২৬, ঢাকা

পদ্মার চরে ঈদ কাটে নির্মল আনন্দে, একে অন্যের বাড়ি খাবার দিয়েই তৃপ্তি

আমানুল্লাহ আমান, রাজশাহী
প্রকাশিত: ২০ মার্চ ২০২৬, ০৯:১৬ এএম

শেয়ার করুন:

পদ্মার চরে ঈদ কাটে নির্মল আনন্দে, একে অন্যের বাড়ি খাবার দিয়েই তৃপ্তি

রাজশাহীর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ঈদুল ফিতরে ভিন্নরকম আমেজ বিরাজ করে। বিশেষভাবে পদ্মা নদী পেরিয়ে ভারত সীমান্তবর্তী চরাঞ্চলে নির্মল আনন্দ ফুটে ওঠে। চরবাসী ঈদে পিঠা-পায়েশ রান্না করে অন্যদের আপ্যায়নের মাঝে খুঁজে পান বাড়তি আনন্দ। শিশুদের আনন্দ আরও বেশিই থাকে ঈদে।

রাজশাহী নগরীর সঙ্গে দেশের বৃহত্তম পদ্মা নদীর সংযোগ রয়েছে। নদী ওপারে রয়েছে বড় বড় ৪টি চর এলাকা। সেগুলো হলো- চর আষাড়িয়াদহ, চর মাজারদিয়াড়, চর খানপুর ও চর খিদিরপুর। শহরের সঙ্গে এসব চরের বাসিন্দাদের যাতায়াতের পথ বেশ দুর্গম। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো তাদের বসবাস। তবে ঈদে কমতি নেই চরবাসীর। চরের বাসিন্দাদের ঈদ মানেই নির্মল আনন্দে কর্মযজ্ঞে ভরা একটি দিন। নদীবেষ্টিত তাদের জনপদে ঈদ মানেই এক ভিন্নরকম অনুভূতি। এসব এলাকায় নেই শহরের কোলাহল, নেই বিলাসিতা বা আভিজাত্যের ছোঁয়া। তবু আনন্দ বিরাজ করে সপ্তাহজুড়ে।


বিজ্ঞাপন


f1c49c24-41d3-4fb4-8202-e22f67fe247f

রাজশাহীর পবা, গোদাগাড়ী ও বাঘা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী চর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চরাঞ্চলের বাসিন্দারা ঈদের কয়েক দিন আগেই নিজেদের কেনাকাটা সম্পন্ন করেন। বিবাহিত মেয়েদের জামাইয়ের বাসায় চাল, ডাল, আটা, চিনি, সেমাই, খেজুর, হাঁস, মুরগিসহ বিভিন্ন খাদ্যসামগ্রী উপহার দিয়ে থাকেন। ঈদের আগের দিন শিশুরা বিকেলে খেলাধুলা করে স্থানীয় মাঠে, চাঁদরাতে সন্ধ্যা মধ্যরাত পর্যন্ত পটকা ও আতশবাজি ফোটায় তারা। মধ্যরাত পর্যন্ত গ্রামের বাজারে কেরাম বোর্ড খেলেন যুবকরা।

এছাড়া ঈদের দিন ভোরে ফজরের নামাজ জামায়াতে আদায়ের জন্য গ্রামের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদে যান। ফজরের নামাজ আদায়ের মধ্য দিয়েই শুরু হয় পবিত্র দিনের যাত্রা। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন ঈদের প্রস্তুতি গ্রহণে। সকালবেলা গোসল করে নতুন ও পছন্দের পোশাক পরিধান করেন। ছোটদের আনন্দ থাকে একটু বেশিই। ঘরে ঘরে রান্নার ব্যস্ততা তৈরি হয় নারীদের। সবমিলিয়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ।

58a1e909-64c3-4950-843c-7a563cac2f85


বিজ্ঞাপন


সকাল সাড়ে ৭টা সাড়ে ৮টার মধ্যে এসব এলাকায় বিভিন্ন ছোট ছোট ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাত। খোলা আকাশের নিচে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করেন। ঈদের নামাজ শেষে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে সবাই কোলাকুলি করেন, বিনিময় করেন ঈদের শুভেচ্ছা।

নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে বসে খাওয়া-দাওয়া করেন সবাই। নারীদের হাতে তৈরি সেমাই, পোলাও ও মাংসসহ নানা আয়োজন যেন ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এরপর শুরু হয় দিনের আরেকটি পরবর্তী আনন্দঘন ব্যস্ততা।

তরুণ-যুবকরা দল বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন ঘুরতে। কেউ যায় পাশের গ্রামে, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান। বৃদ্ধরা নতুন পোশাক পরে চায়ের দোকানে বসেন আড্ডায়। শিশুরা লুকোচুরি খেলে। তরুণ-কিশোররা পানিতে খেলাধুলায় সময় কাটান। এছাড়া গ্রামের মাঠে ঘোষণা দিয়ে টুর্নামেন্টও হয়। নারীরাও পিছিয়ে থাকেন না। নতুন পোশাক পরে তারা যান আশপাশের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে। কুশল বিনিময় গল্প আর আপ্যায়নের মধ্য দিয়ে কাটে তাদের সময়। সব মিলিয়ে রাজশাহীর চরাঞ্চলে ঈদ হয় আনন্দে ভরা।

260d0227-ed7d-4308-8993-a3f56a7942b6

আরও পড়ুন

জয়পুরহাটে দুই হাজার অসহায় মানুষের মাঝে ঈদ সামগ্রী বিতরণ

রাজশাহী ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালের সিনিয়র স্টাফ নার্স শামীম হোসেনের বাসা গোদাগাড়ি উপজেরার চর আষাড়িয়াদহ এলাকায়। শামীম ঢাকা মেইলকে বলেন, সকালে আগে ফজরের নামাজ পড়ে এসে হালকা মিষ্টান্ন খাবার খাই আমরা। এরপর গোসল করে ঈদের নামাজ পড়ে যাই। নতুন পোশাক ও আতর সুরমা সুগন্ধি তো থাকেই। সবচেয়ে আনন্দের দিনে আমরা যেটি গুরুত্ব দিয়ে করি সেটা হলো, একে অপরে খাবার ভাগাভাগি করা। মানে সবার বাড়িতেই বিভিন্ন পদের খাবার রান্না হয়। তবু আমরা পরস্পরে খাবার দেই, নিজেরা অন্যদের দেওয়া খাবার খাই। এটা আমাদের ঐতিহ্য বলা যায়। এতে পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়।

কৃষক ফারুক হোসেন ঢাকা মেইলকে বলেন, আমরা মাঠে কাজ করা মানুষ বাবা। তবে ঈদ আইসলে খুব ভালো লাগে। নতুন জামা কাপড় পরি, তারপর নামাজ পড়ে এসে খাওয়াদাওয়া করে, বাজারে গিয়ে সময় কাটাই, আত্মীয়ের বাড়ি যাই। আমাদের খুব ভালোই লাগে ঈদে।

150b1bc5-f529-497d-803c-cbc596a9f544

সজিব হোসেন নামে এক শ্রমিক বলেন, আমরা সারাবছর কাজ করে খাই। ঈদের সময়ও এখন ম্যালা কাজ মাঠে। কিন্তু ঈদে সময় কাজ করি না তেমন। ছুটো ছওয়ালেরে (ছোট ছেলেমেয়ে) আনন্দ বেশি থাকে। ওরা খেলাধুলা করে। সুময় পাইলে অরেক ব্যাড়াত লিয়্যা গেনু।

পবার চর মাজারদিয়াড় এলাকার আব্দুল খালেক নামে এক বাসিন্দা বলেন, আমারে সমস্যা হলো যোগাযোগ। ঈদের দিন তো সবাই আনন্দ করে। আমাদেরও হয়। কিন্তু আমাদের আত্মীয়রা শহরের দিকে আছে, ওদিক ওরে বাড়ি। আমরা যাব ভালোভাবে এড্যা সমস্যা। দিনে যায়্যা দিনে ঘুরে আসা যায় না। আবার নৌকা পাওয়া সমস্যা হয়। সেজন্য একটু কষ্টই হয় আমাদের। যোগাযোগ ভালো থাইকলে সমস্যা হয় না। তবে আনন্দে কাটে।

প্রতিনিধি/এসএস

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর