দেশের একেবারে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। হিমালয় পর্বতমালার সান্নিধ্যে থাকায় এ জেলাকে বলা হয় ‘হিমালয়ের কন্যা'। শীতকালে আকাশ পরিষ্কার থাকলে এখান থেকেই দেখা যায় পৃথিবীর তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ কাঞ্চনজঙ্ঘার শুভ্র চূড়া তিন দিক ভারতীয় সীমান্তে ঘেরা এই জনপদ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির এক অনন্য সমন্বয় ঈদের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুরা চাইলে ঘুরে আসতে পারেন শান্ত-স্নিগ্ধ এই জেলায়। কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন ছাড়াও পঞ্চগড়ে রয়েছে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও দর্শনীয় স্থান।
মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন মির্জাপুর শাহি মসজিদ
বিজ্ঞাপন
পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক মির্জাপুর শাহী মসজিদ। জেলাশহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মসজিদটি ১৬৫৬ সালে মুঘল আমলে নির্মিত বলে ধারণা করা হয়। মসজিদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ ফুট ও প্রস্থ ২৫ ফুট। একই সারিতে তিনটি গম্বুজ এবং কোনায় মিনার মুঘল স্থাপত্যের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলেছে। দেয়ালের টেরাকোটার নকশাগুলো প্রতিটি আলাদা কারুকাজে তৈরি। ইতিহাস ও স্থাপত্য প্রেমীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় স্থান।
ইতিহাসের সাক্ষী মহারাজার দিঘি

পঞ্চগড় সদর উপজেলার ভিতরগড় এলাকায় প্রায় ৫৪ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মহারাজার দিঘি। প্রায় দেড় হাজার বছরের পুরোনো এই জলাধার পৃথু রাজা ও ভিতরগড় দুর্গনগরীর ইতিহাস বহন করে। ইট বাঁধানো ১০টি ঘাট, প্রায় ২০ ফুট উঁচু পাড় এবং চারপাশের সবুজ পরিবেশ দর্শনার্থীদের মুগ্ধ করে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, পৃথু রাজা আত্মমর্যাদা রক্ষায় পরিবারসহ এই দিঘিতে আত্মাহুতি দেন।
বিজ্ঞাপন
সমতলের চা বাগানের অপরূপ সৌন্দর্য

পঞ্চগড় এখন দেশের সমতলের অন্যতম চা উৎপাদন এলাকা। ২০০০ সাল থেকে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে চা চাষ শুরু হয়। জেলার বিভিন্ন স্থানে সারি সারি চা গাছের বাগান প্রকৃতিপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে। কাজে অ্যান্ড কাজে, এমএমটি, স্যালিলনসহ বেশ কয়েকটি টি-স্টেট পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সীমান্তের স্পর্শ বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট

তেঁতুলিয়া উপজেলার বাংলাবান্ধা ইউনিয়নে অবস্থিত বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্ট। এটিকে বাংলাদেশের মানচিত্রের সূচনা বিন্দু বলা হয়। এখানে দাঁড়িয়ে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এছাড়াও শনিবার ও মঙ্গলবার বিকেলে সীমান্তে বিজিবি-বিএসএফের যৌথ প্যারেড দেখতে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে।
দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘর: রকস মিউজিয়াম

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠিত রকস মিউজিয়াম। এখানে রয়েছে এক হাজারের বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক ও লোকজ সংগ্রহ। আগ্নেয়শিলা, পাললিক শিলা, নুড়িপাথর, খনিজ বালি, পোড়ামাটির মূর্তি, মুঘল ও ব্রিটিশ আমলের মুদ্রাসহ নানা ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে এখানে।
নদীতীরের সৌন্দর্যে তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো

মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক তেঁতুলিয়া ডাক বাংলো পঞ্চগড়ের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন স্থান। ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত এই ডাক বাংলোটি উঁচু গড়ের ওপর অবস্থিত। বর্ষায় মহানন্দা নদীর সৌন্দর্য আর শীতকালে এখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে। বর্তমানে এখানে একটি পিকনিক কর্নারও তৈরি করা হয়েছে।
প্রাচীন তীর্থস্থান ধলেশ্বরী মন্দির

বোদা উপজেলার করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত ধলেশ্বরী মহাপীঠ মন্দির একটি প্রাচীন তীর্থস্থান। প্রায় ২.৭৮ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত এই মন্দিরকে ঘিরেই বোদা উপজেলার নামকরণ হয়েছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
এছাড়াও পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় ভারতীয় সীমান্তের কাঁটাতারের ওপারে মেঘের মধ্যে বিরল-সূর্যাস্ত আরেকটি মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সন্ধ্যায় মহানন্দা নদীর তীরে বসে এই দৃশ্য দেখতে পান পর্যটকরা। অন্যান্য দর্শনীয় স্থানের মধ্যে প্রত্নস্থল ভিতরগড়, পঞ্চগড় সদরের রক মিউজিয়াম, বোদা উপজেলার ধলেশ্বরী মন্দির, মির্জাপুর শাহী মসজিদ, আটোয়ারী উপজেলার ইমামবাড়া মসজিদও কম মনোমুগ্ধকর নয়।
বিগত কয়েকবছর ধরে পর্যটকদের সংখ্যা বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয়রা, বিশেষ করে যারা বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তারা বিভিন্ন নতুন সেবা ও সুযোগ-সুবিধা চালু করলেও চাহিদার তুলনায় তা অপ্রতুল।
পঞ্চগড়ে ও তেঁতুলিয়ার পর্যটন শিল্প বিকাশে যেসব স্বেচ্ছাসেবী কাজ করেন, তাদের মতে, বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ড এবং পর্যটন করপোরেশন এই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারে এবং পর্যটকদের জন্য আরও ভালো সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে এলাকার আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে মনে করছেন অনেকে।
তবে একটি আদর্শ পর্যটনস্থল হওয়ার ক্ষেত্রে পঞ্চগড় অনেক বেশি পিছিয়ে আছে। পর্যাপ্ত আবাসন, মানসম্পন্ন খাবার হোটেল এবং যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলে পঞ্চগড়ে আরো অনেক বেশি পর্যটক আসবে বলে মনে করেন বেশিরভাগ মানুষ।
যেভাবে যাওয়া যাবে
রাজধানী ঢাকার শ্যামলী, গাবতলী ও মিরপুর থেকে নাবিল পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজসহ বিভিন্ন বাসে সরাসরি পঞ্চগড় যাওয়া যায়। নন-এসি ভাড়া: ৯০০-১১০০ টাকা, এসি ভাড়া: ১৭০০-১৯০০ টাকা, ট্রেনে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে পঞ্চগড় এক্সপ্রেস, একতা এক্সপ্রেস ও দ্রুতযান এক্সপ্রেসে যাওয়া যায়। পঞ্চগড় বা তেঁতুলিয়ার পথে কোনো এসি বাস নেই। তেঁতুলিয়ায় নেমে বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর, চা বাগান বা আশপাশের এলাকায় ঘুরাঘুরির জন্য স্কুটার, অটোরিক্সা, অটোভ্যান এবং মাইক্রোবাস ভাড়া পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলার দিক দিয়ে তেঁতুলিয়া সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা থাকায় মনের ইচ্ছে মতো ঘুরে উপভোগ করা যাবে দর্শনীয় স্থানসমূহ।

থাকার জন্য হোটেল, রেস্টুরেন্ট
দেশের এই উত্তরের এ জেলায় ঘুরতে এসে থাকতে চাইলে কোথায় থাকবেন। প্রথমত পঞ্চগড় জেলা শহরে সেন্ট্রাল গেস্ট হাউজ, হোটেল মৌচাক, হোটেল রাজনগর, হিলটন বোর্ডিং, এইচ কে প্যালেস ও হোটেল প্রীতমসহ বেশ কিছু আবাসিক হোটেল রয়েছে। পর্যটন শিল্প ঘিরে তেঁতুলিয়ায় সরকারি রেস্ট হাউস, ঐতিহাসিক ডাক বাংলো, পিকনিক কর্নার, বেরং কমপ্লেক্স, এবং ইএসডিও মহানন্দা কটেজ, স্কয়ার, আবাসিক হোটেল, হিমালয় আবাসিক হোটেল, স্বপ্ন গেটস হাউক,কাজী ব্রাদার্স, সীমান্তের পাড়, কাঞ্চনজঙ্ঘা আবাসিক হোটেল, তেঁতুলিয়া কাঠের বাড়িতে আগাম বুকিংয়ের মাধ্যমে থাকা যায়।

এদিকে তেঁতুলিয়ায় সরকারিভাবে ডাকবাংলো, পিকনিক কর্নারে রয়েছে নতুন ভবন। এখানে থাকতে চাইলে আগে থেকেই তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। দুই বেডের প্রতি কক্ষের ভাড়া পড়বে ৭০০ টাকা। বন বিভাগের রেস্ট হাউসে থাকার জন্য জেলা সদর অথবা তেঁতুলিয়ায় বন বিভাগ থেকে অনুমতি নিতে হবে। বাংলাবান্ধা স্থলবন্দরেও জেলা পরিষদের ডাকবাংলো আছে, এখানে থাকার অনুমতি নিতে হবে পঞ্চগড় থেকে। এখানে প্রতি কক্ষের ভাড়া ৬০০ টাকা। এছাড়াও জেলা পঞ্চগড়ে রয়েছে অনেক আবাসিক হোটেল। ভাড়া পড়বে ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। হাজার টাকার মধ্যে পেয়ে যাবেন এসি রুম। তেঁতুলিয়ায় ১৮টি গেস্ট হাউজ এবং হোটেলে ২০০ জনের থাকার ব্যবস্থা আছে, এছাড়া 'কমিউনিটি ট্যুরিজম'-এর উদ্যোগের অংশ হিসেবে ভাড়া দিয়ে স্থানীয়দের বাসা-বাড়িতে দর্শনার্থীরা রাত্রি যাপন করতে পারেন।
নিরাপত্তায় টুরিস্ট পুলিশ
টুরিস্ট পুলিশ পঞ্চগড় জোনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঈদ উপলক্ষে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে টহল জোরদার করা হয়েছে। যাতে কোনো পর্যটক হয়রানি বা ইভটিজিংয়ের শিকার না হন, সেজন্য প্রশাসন ও টুরিস্ট পুলিশ সার্বক্ষণিক কাজ করছে।
প্রতিনিধি/এসএস

