ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান নদীর পাড়ে পুরাতন রাস্তার দুই পাশে প্রায় দুই হাজার গাছ কাটার প্রকল্প আপাতত স্থগিত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে এক সপ্তাহে অন্তত ১২০টি মূল্যবান গাছ কাটার পর জেলা প্রশাসনের নির্দেশে গাছ কাটা বন্ধ করা হয়।
বন বিভাগের মাধ্যমে দরপত্রের ভিত্তিতে ঠিকাদারদের দিয়ে গাবখান বাজার থেকে বারুহাট পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকায় এই গাছ কাটার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিকদের প্রতিবাদের পর বিষয়টি জেলা প্রশাসনের নজরে আসে।
বিজ্ঞাপন
পরিবেশকর্মী ও সাংবাদিক ইসমাঈল মুসাফির প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানান এবং জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি দিয়ে গাছ কাটা বন্ধের অনুরোধ করেন। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (HRPB) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ উচ্চ আদালতের একটি রায়ের বিষয়টি জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিনকে অবহিত করেন।

বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) দুপুরে গাছ কাটা চলমান থাকার বিষয়টি আবারও জেলা প্রশাসককে জানানো হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ঝালকাঠি জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকারকে গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গাবখান নদীর পাড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি ব্লক ফেলার প্রকল্প চলমান রয়েছে। নদীর পাড় ঘেঁষে পুরাতন ও নতুন দুটি রাস্তা রয়েছে। গাবখান বাজার থেকে বারুহাট পর্যন্ত প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকায় পুরাতন রাস্তা থেকে নদীর পানি পর্যন্ত শুকনো পাড়ের গড় প্রস্থ প্রায় ২০ ফুটের বেশি, কোথাও কোথাও তা ৫০ ফুট পর্যন্ত বিস্তৃত। এত জায়গা থাকার পরও পুরাতন রাস্তার অংশেও ব্লক ফেলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই রাস্তার দুই পাশের হাজার গাছ কাটার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বিজ্ঞাপন

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রায় দেড় বছর আগে গাছ কাটার অনুরোধ জানায়। পরে কয়েক দফা বৈঠকের পর কমিটির সিদ্ধান্তে জেলা প্রশাসকের অনুমোদনে গাছ কাটার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই অনুযায়ী ৪৭টি লটে মোট ১ হাজার ৮১৫টি গাছ কাটার জন্য চিহ্নিত করা হয় এবং দরপত্রের মাধ্যমে ঠিকাদারদের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
বন বিভাগের নথিতে দেখা গেছে, প্রতিটি লটে গড়ে প্রায় ৪০টি করে গাছ রাখা হয়েছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, বাস্তবে একেকটি লটে প্রায় ৫০টি গাছ কাটা হতে পারে। সে হিসেবে মোট গাছের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৩৫০টি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
পরিবেশকর্মী ও ঝালকাঠির সিনিয়র আইনজীবী নাসির উদ্দীন কবীর বলেন, “দুই হাজার বা তার বেশি গাছ কাটার চিন্তা একজন প্রকৌশলীর মাথায় আসে কীভাবে, তা ভাবাই কঠিন। এখানে সামাজিক বনায়ন রয়েছে, প্রায় শতাধিক প্রজাতির পাখি ও বিভিন্ন সরীসৃপের আবাসস্থল। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে এই গাছ কাটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।

বন বিভাগের নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৮০০ গাছের হিসাবেই ২৬ প্রজাতির গাছ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাজ কড়ই, কাঞ্চন, তুলা, অর্জুন, শিশু, বাবলা, তেঁতুল, জারুল, কড়ই, জাম, নিম, কাঁঠাল, গামার, সেগুন ও উড়িআমসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ। বাকি গাছগুলো হিসাব করলে এসব প্রজাতির সংখ্যা আরও বাড়বে।
ইতোমধ্যে তিনটি স্থানে তিনটি লটের প্রায় ১২০টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। কাটা গাছগুলোর মধ্যে রাজ কড়ই, অর্জুন, শিশু, তুলা, নিম ও বাবলাসহ অন্তত ১৫ প্রজাতির গাছ রয়েছে।
বন বিভাগ সূত্র জানায়, ৪৭টি লটের মধ্যে ৩৭টি লটের কাজ পেয়েছিলেন ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার নজরুল মেম্বারসহ চারজন ঠিকাদার। বাকি ১০টি লট পেয়েছেন ঝালকাঠি সদর ও কাঠালিয়া উপজেলার তিনজন ঠিকাদার। ১ হাজার ৮১৫টি গাছ কাটার বিপরীতে দরপত্রে প্রায় ৬০ লাখ টাকা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
ঝালকাঠি জেলা বন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. জাকিরুল হক সরকার বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশ পাওয়ার পর গাছ কাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমার নির্দেশ ছাড়া এখন আর কেউ একটি ডালও কাটতে পারবে না। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনুরোধে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর এই সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
জেলা প্রশাসক মো. মমিন উদ্দিন বলেন, সিনিয়র আইনজীবী মনজিল মোরশেদ উচ্চ আদালতের একটি রায়ের কথা উল্লেখ করেছেন। গাছ কাটার সময় এই রায়টি ছিল না। তাই আপাতত গাছ কাটা বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, উচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ একটি কমিটি গঠন করে তাদের সুপারিশ ছাড়া এভাবে গাছ কাটা যায় না। আইন অনুযায়ী এই গাছ কাটার প্রক্রিয়া স্থগিত রাখতে হবে।
প্রতিনিধি/এসএস

