উত্তর জনপদের আলোকিত এক মানুষ আব্দুর রাজ্জাক মাস্টার। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন, সংগঠিত করেছেন তরুণ-যুবকদের। বিজয় অর্জনের পর নিজ এলাকায় গড়ে তোলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এরপর হাজার হাজার পরিবারে ছড়িয়েছেন জ্ঞানের আলো। কোটি মানুষকে কাঁদিয়ে রাজশাহীর তানোর উপজেলার গুণী এই ব্যক্তি না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) দুপুর সাড়ে ১২টায় নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে ৮২ বছর বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
বিজ্ঞাপন
বুধবার (৪ মার্চ) দুপুরে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে। দুই ছেলে চার মেয়েসহ অসংখ্য শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন তিনি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রাজ্জাকের বাসা রাজশাহীর তানোর উপজেলার তালন্দ গ্রামে। ১৯৪৪ সালের ১১ নভেম্বর তৎকালীন মালদহ জেলার চাঁপাইনবাবগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের শিবিরের হাট এলাকা) পিরোজপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দেরাশতুল্লাহ মন্ডল-সাহেরা বিবি দম্পতির ৫ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। তার ভাই জালাল উদ্দিনও বীর মুক্তিযোদ্ধা। শিক্ষক হওয়ায় তিনি ‘রাজ্জাক মাস্টার’ নামে সুপরিচিত। তার এফএফ নম্বর ০১৮১০০০১৫৩৩ এবং লাল মুক্তিবার্তা নম্বর ০৩০২০৮০০০৫।

জানা গেছে, ১৯৬৬ সালে ছাত্রজীবন শেষে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াতে আব্দুর রাজ্জাক রাজশাহীর তানোরে এসে বসবাস শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি সমাজ সংস্কারক হিসেবে কাজ শুরু করেন তিনি। স্বাধীন দেশে একটানা ৩৯ বছর শিক্ষা প্রশাসন পরিচালনা করেছেন নিজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। ১৯৬৫ সালে তালন্দ আনন্দ মোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা এবং প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব অত্যন্ত প্রজ্ঞা মেধা আর বিচক্ষণতার সাথে পালন করেন। এলাকায় তার সুখ্যাতি ছড়ায় অল্পদিনেই। ছাত্রজীবনের ধারাবাহিকতায় চাক জীবনে এসে দেশের মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখতেন, ‘৬৬-এর ছয় দফা, ‘৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ‘৭০-এর নির্বাচন- প্রতিটি ঘটনায় ওতপ্রতভাবে জড়িত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর ১৯৭১ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তানোর থেকে রাজশাহী হয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ গিয়ে নিজ জন্মস্থান সুন্দরপুর এলাকা থেকে ৫-৬ জনকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য মালদহের জঙ্গিপুরের স্যাকারিপুরে যান। সেখানে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা সন্তোষ মৈত্রের পরামর্শে পুনরায় দেশে ফিরে আসেন আরও বেশি মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহের উদ্দেশ্য। এই দফায় তিনি আরও ২০-২২ জনকে সঙ্গে নিয়ে গৌড়বাগান ইয়্যুথ ক্যাম্পে ভর্তি করিয়ে মূল ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়। গৌড়বাগান ক্যাম্পে অবস্থাকলীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে যাওয়া তরুণ-যুবকদের উদ্বুদ্ধকরণে বক্তব্য ও প্রাথমিক ট্রেনিং প্রদান করতে থাকেন। ২০০৪ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তালন্দ ললিত মোহন ডিগ্রি কলেজের প্রতিষ্ঠাকালীন তার ভূমিকা ও অবদান অনস্বীকার্য। তিনি গভর্নিং বডির প্রতিষ্ঠাতা বিদ্যোৎসাহী সদস্য ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে।
বিজ্ঞাপন

উত্তর জনপদের আলোকিত এই ব্যক্তিত্ব আব্দুর রাজ্জাক মাস্টার মৃত্যুর আগে ঢাকা মেইলকে দেওয়া সর্বশেষ এক সাক্ষাৎকারে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতিচারণ করেছিলেন। ২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মে মাসে ১ম সপ্তাহে তানোর থেকে রাজশাহীতে গেলে গণি দারোগার সঙ্গে দেখা হয়। গনি দারোগা আমাকে বলেন, ‘আপনি লিস্টেড, আপনি তিন নম্বরে আছেন। এক নম্বরে আছে মুন্ডুমালার মতিউর রহমান, তিনে আপনিসহ ১৭ জনা মোট।’ সেদিনই রাজশাহী থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলে যাই। সেখানেও আমার নাম কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার খবর পাই। সেদিন রাতেই গ্রামের বাড়ি গিয়ে মায়ের সঙ্গে দেখা করে নিজ ছোট ভাইসহ ৫-৬ জনকে নিয়ে ভারতে চলে যাই।’

আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘মে মাসের ৮/৯ তারিখ ভারত গেছি। শামসুল হুদা, হেলাল এরা সঙ্গে গেছিল, লালগোলায় উঠলাম। রাতে না খায়্যা, দিনে না খায়্যা জোহরপুর বর্ডার দিয়্যা নৌকা চালায়ে গেলাম। আসরের সময় উঠলাম সেকারিপুরে। তার পরদিন গৌড়বাগান ক্যাম্পে গেলাম। বাচ্চু ডাক্তার ছিল, মইনুদ্দিন, মজিবুর এরা ছিল। সেখানে নাম লিখে নিল, আমার আন্ডারে ২০-২২ জন। আমাকে বলল, আপনি অ্যাডজুটেন্ট হয়ে থাকবেন। প্রায় ১৯০০ ছাইল্যা (ছেলে); ৩টা ভাগ করে। আমি একটাতে বক্তব্য রাখি, মইনুদ্দিন একটাতে বক্তব্য রাখে, ইংরেজির প্রফেসর ইবরাহিম আরেকটাতে। আবার মালদাহ ফিরে আসলাম। রাজশাহী থেকে যারা পালিয়ে আসলো তাদের আশ্রয় ও মোটামুটি ৪২ জনকে খাবার একসঙ্গে দিই। জানতে পারি, আদমপুর ক্যাম্পে আমাদের ১৮ জনকে শত্রুপক্ষ ভেবে আটকানো আছে, অরা গেছে, কিন্তু অরাকে খাইতে দেইনি আটকে রেখেছে। তারা এমএনএ‘র নাম বলতে পারছে না। তাদের গিয়ে বাঁচাই।’

আব্দুর রাজ্জাকের ইন্তেকালের খবরে মঙ্গলবার তানোরের তালন্দ এলাকায় তার বাসায় ছুটে আসেন রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলার হাজার হাজার মানুষ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শেষবার দেখতে আসেন স্বজনরা। বুধবার (৪ মার্চ) তার জানাজার নামাজে অংশ নেন লাখো জনতা। রাষ্ট্রীয় যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদান হিসেবে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। জাতীয় পতাকা দিয়ে আচ্ছাদিত মরহুমের মরদেহে পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়।

এ সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এবং রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, তানোর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোছা. নাঈমা খাতুন এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক, ব্যাংকার, রাজনীতিবিদসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন। জানাজার নামাজে ইমামতি করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির এবং রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। নামাজে জানাজায় কান্নার রোল পড়ে যায়। অশ্রসিক্ত নয়নে তাকে শেষ বিদায় জানান লাখো জনতা।
প্রতিনিধি/এসএস

