গাজীপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত ডাচ-বাংলা ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের প্রায় ২৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনার এক মাস পার হলেও এখনো রহস্যের জট কাটেনি। লুট হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ উদ্ধার তো দূরের কথা, এ ঘটনায় জড়িত কোনো দুর্বৃত্তকেও গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। সামনে পবিত্র ঈদুল ফিতর ঘিরে নগরজুড়ে যখন আর্থিক লেনদেন বাড়ছে, ঠিক তখনই এমন দুঃসাহসিক ছিনতাই নগরবাসীর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জানুয়ারি বিকেল সোয়া ৪টার দিকে গাজীপুর মহানগরের বাসন থানাধীন চান্দনা-চৌরাস্তা আউটপাড়া এলাকার কাজিমউদ্দিন চৌধুরী উচ্চবিদ্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিবর্ষণ করে চাঞ্চল্যকর ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।
বিজ্ঞাপন
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২-৩টি মোটরসাইকেলে করে আসা ৭-৮ জনের একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র চক্র অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হামলা চালায়। প্রথমে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়, এরপর ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেয় দুর্বৃত্তরা। আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটোছুটি শুরু হলে তারা সুযোগ বুঝে ব্যাংকের টাকা বহনকারী ব্যক্তিদের ওপর হামলে পড়ে। এক পর্যায়ে ব্যাংকের ভোগড়া-বাইপাস এজেন্ট ব্যাংকিং শাখার মানি কালেক্টর হাবিবুর রহমান ও তার সহযোগী ২৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। পুরো ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত দ্রুত, সুসংগঠিত ও পূর্বপরিকল্পিত, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। প্রকাশ্য দিবালোকে এমন দুঃসাহসিক হামলার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নগরজীবনে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও গভীর হয়।
এ ঘটনায় ভোগড়া-বাইপাস শাখার ব্যবস্থাপক মো. আজিজুল হাসান বাদী হয়ে বাসন থানায় মামলা দায়ের করেন।
বিজ্ঞাপন
তিনি অভিযোগ করেন, একটি সংঘবদ্ধ সশস্ত্র চক্র সুপরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে ককটেল বিস্ফোরণ ও আগ্নেয়াস্ত্রের ভয় দেখিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ লুট করে পালিয়ে যায়। ঘটনার পরপরই স্থানীয় থানা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং সিআইডি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করে। একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা একযোগে কাজ করলেও এক মাসেও উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় জনমনে হতাশা বাড়ছে।
তিনি বলেন, এতগুলো ব্যবসার টাকা লুট হলেও পুলিশ কোনো আসামি গ্রেফতার করতে পারেনি। এমন কি যে মোটরসাইকেল দিয়ে দুর্বৃত্তরা টাকা লুট করেছে সেই মোটরসাইকেলও জব্দ হয়নি। আমরা দ্রুত আমাদের লুণ্ঠিত টাকা ফেরত চাই।
স্থানীয়দের দাবি, এক মাস পার হলেও টাকা উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এখন সামনে ঈদুল ফিতর। এই সময়টিতে ব্যাংকের এজেন্ট, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ বড় অঙ্কের টাকা বহন করেন, যা অপরাধীদের জন্য সহজ টার্গেটে পরিণত হয়। ফলে নিরাপত্তা জোরদার না হলে এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

এ ব্যাপারে বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ আশপাশের অন্তত ১০টি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট থেকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০টি সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে। এসব ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ছিনতাইয়ে মোট আটজন জড়িত ছিল। তিনটি মোটরসাইকেলে সাতজন ঘটনাস্থলে আসে এবং একজন আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্তের ধীরগতির বিষয়ে তিনি বলেন, অপরাধীরা হেলমেট ও মাস্ক পরিহিত থাকায় তাদের চেহারা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা প্রযুক্তির সহায়তায় ফুটেজগুলো বিশ্লেষণ করছি। তদন্ত চলমান রয়েছে এবং খুব দ্রুতই অগ্রগতি দৃশ্যমান হবে।
তবে পুলিশের এই আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের অভিযোগ, ঘটনার পরপরই কঠোর ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতার সম্ভব হতে পারত। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো গ্রেফতার না হওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
প্রতিনিধি/এসএস

