রোববার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ঢাকা

ক্রমেই জটিল হচ্ছে নড়াইলের দুটি আসনের ভোটের হিসাব

মো. হাবিবুর রহমান, নড়াইল
প্রকাশিত: ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম

শেয়ার করুন:

N
নড়াইল-১ ও নড়াইল-২ আসনের উল্লেখযোগ্য কয়েকজন প্রার্থী। ছবি- প্রতিনিধি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নড়াইলের দুটি সংসদীয় আসন্ন নড়াইল-১ ও নড়াইল-২ এ রাজনৈতিক পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। দুই আসনেই বিএনপির মনোনয়ন বিতর্ক ও শক্তিশালী বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই বিভাজনের সুযোগ কাজে লাগাতে মাঠ গোছাচ্ছে জামায়াতে ইসলামী।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও স্থানীয় ভোটারদের মতে, সংগঠিত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ অবস্থানের কারণে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থীরা এবার সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। নড়াইলের রাজনীতিতে এবারের নির্বাচন শুধু দলীয় প্রতীক কিংবা জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতায় সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি রূপ নিয়েছে দলীয় ঐক্য, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, তৃণমূলের ক্ষোভ ও কৌশলগত রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায়।


বিজ্ঞাপন


অন্যদিকে বিদ্রোহে নড়বড়ে বিএনপির ভিত, হিসাব কষছে জামায়াত। বিএনপির দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটব্যাংক থাকলেও এবারের নির্বাচনে দুই আসনেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয় উপস্থিতি দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই নড়াইলের রাজনীতিতে আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে দলীয় কোন্দল, বহিষ্কার, ক্ষুব্ধ তৃণমূল এবং বিভক্ত কর্মীবাহিনী নিয়ে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী কোনো বিদ্রোহী প্রার্থী ছাড়াই শুরু থেকেই মাঠে রয়েছে।

নড়াইল-১ আসনটি কালিয়া উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন, কালিয়া পৌরসভা এবং নড়াইল সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। তবে এই মনোনয়নকে কেন্দ্র করেই দলের ভেতরে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ প্রকাশ্যে আসে।

ধানের শীষের প্রার্থী বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বিভেদ ভুলে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। সারাদেশে ধানের শীষের পক্ষে যে গণজোয়ার তৈরি হয়েছে, তাতে সব ষড়যন্ত্র ভেসে যাবে। আমি ৩০ বছর মানুষের পাশে ছিলাম, তারা আমাকে হতাশ করবে না।

স্থানীয় বিএনপির একাংশের অভিযোগ, তৃণমূল নেতাকর্মীদের মতামত উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে দলের নিবেদিত নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বিএনপি ও জিয়া পরিষদের নেতা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বিএম নাগিব হোসেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনি মাঠে নামেন। এই আসনে মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।


বিজ্ঞাপন


নড়াইল ১ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী (দাড়িপাল্লা প্রতীক) মাওলানা ওবায়দুল্লাহ কায়সার বলেন, ‘সাধারণ মানুষের মধ্যে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ব্যাপক সাড়া দেখছি। ভোটাররা এবার সৎ ও যোগ্য প্রার্থী বেছে নেবেন। ইনশাআল্লাহ, ১২ ফেব্রুয়ারি জয়ের হাসি আমরাই হাসব।

স্বতন্ত্র প্রার্থী (কলস প্রতিক) বিএম নাগিব হোসেন বলেন, ‘বিজয় আমাদের সুনিশ্চিত। তৃণমূলের ভোটাররা আমাদের সঙ্গে আছেন। ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের সমর্থন নিয়েই আমরা লড়ছি।’

তবে ভোটারদের চাওয়া, এ আসনে মানবতার সেবায় নিবেদিতপ্রাণ একজন মানুষ, নির্বাচিত হয়ে যিনি সুখে-দুঃখে এলাকাবাসীর পাশে থাকবেন, এলাকার উন্নয়ন শান্তি সমৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করবেন। জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল-১ আসনে মোট ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৫৫ জন ভোটার রয়েছেন।

অন্যদিকে নড়াইল-২ আসনটি লোহাগড়া উপজেলা ও নড়াইল সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত। এখানে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। প্রথমে জেলা বিএনপির সদ্য বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও শেষ মুহূর্তে তা প্রত্যাহার করে ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদকে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়।

আসনটির ধানের শীষের প্রার্থী ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, বিএনপির বিদ্রোহী বলে কিছু নেই। দল একজনকেই মনোনয়ন দিয়েছে। আমিই বিএনপির একমাত্র প্রার্থী।
 
এদিকে সিদ্ধান্তে দলের ভেতরে তীব্র অসন্তোষ দেখা দেয়। মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে মনিরুল ইসলাম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘কলস’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেন। মাঠে দুই বিএনপি প্রার্থী, বিভ্রান্ত ভোটার
নড়াইল-২ আসনে এখন কার্যত বিএনপির দুই প্রার্থী মাঠে রয়েছেন। মনিরুল ইসলামের পক্ষে দলের একটি বড় অংশ সরাসরি কাজ করছে। ফলে বিএনপির ঐতিহ্যগত ভোটব্যাংক বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একই দলের দুই প্রার্থীর মুখোমুখি অবস্থান অনেক সাধারণ ভোটারকে বিভ্রান্ত করছে। কেউ কেউ প্রকাশ্যে বলছেন, এই বিভাজনের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে বিএনপিরই। 

দলটির একাধিক স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেছেন, বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এক নেতা বলেন, বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় আমরা বিব্রত। এতে দলের ক্ষতি হচ্ছে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই। এই আসনেও মোট ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

জামায়াতে ইসলামীর (দাড়িপাল্লা প্রতীক) প্রার্থী আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, ভোটের মাঠে আমি কেউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করি না, প্রতিযোগী মনে করি। আমি ঐক্যবদ্ধ বিএনপিকে মোকাবিলা করার জন্য দেড় বছর ধরে ভোটের মাঠে রয়েছি। বিএনপির ভাঙনে আমার সুযোগ নিতে হবে, এটা আমি মনে করি না।

স্বতন্ত্র প্রার্থী (কলস প্রতীক) মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, আমি একজন বিএনপির কর্মী। ৩৯ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে রয়েছি, তাদের সুখে-দুঃখে পাশে থেকেছি। তাদের সঙ্গে মামলায় ছিলাম, জেল হাজতে ছিলাম। তাদের সঙ্গে আমার পারিবারিক রাজনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে, তারা কেউ আমাকে ছেড়ে যাবে না।

এদিকে নড়াইল-২ আসনের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ভোটারদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া। সাধারণ ভোটারদের ভাষ্য, যিনি সত্যিকার অর্থে পাশে থাকবেন, তাকেই ভোট দেব। প্রতিশ্রুতি নয়, কাজ দেখতে চাই। 

জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নড়াইল-২ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৯০ হাজার ৯৮৮ জন।

এএইচ

ঢাকা মেইলের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ
জনপ্রিয়

সব খবর