দেশের সরকারি হাসপাতালে গর্ভবতী নারীদের প্রসবসংক্রান্ত চিকিৎসা সেবায় অনিয়ম, অনীহা ও রেফার নির্ভর চিকিৎসা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। যাদের অর্থনৈতিক সামর্থ্য আছে তারা বেশিরভাগই বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে সিজার করিয়ে নিলেও, অসচ্ছল ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সরকারি হাসপাতালেই শেষ আশ্রয় খোঁজেন। কিন্তু সেখানে প্রতিনিয়ত রেফারের চাপে পড়তে হচ্ছে তাদের।
সরেজমিনে জানা গেছে, সরকারি হাসপাতালে নরমাল ডেলিভারি বা সিজার দুই ক্ষেত্রেই রোগীদের অনেক সময় সেবা দেওয়া হয় না। সপ্তাহে ও বছরে হাতে গোনা কয়েকটি অপারেশন করা হলেও বাকিদের বিভিন্ন অজুহাতে বেসরকারি ক্লিনিকে রেফার করে দেওয়া হয়। ফলে অর্থসংকটে থাকা গর্ভবতী নারীরা পড়েন চরম দুশ্চিন্তা ও হতাশায়। জীবনের ঝুঁকি মাথায় নিয়েই তাদের ঠাঁই খুঁজতে হয় এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে।
বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে সচেতন মহল জানান, যখন সরকারি হাসপাতালই সেবা পাওয়া যায় না, তাহলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রতি আস্থা আরও কমে যাবে। সংশ্লিষ্টদের এদিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
ভুক্তভোগী মোসা. সায়মা আক্তার বলেন, আমার মেয়েকে নিয়ে একদিন রাতে সরকারি হাসপাতালে গেলে তারা কোনো গুরুত্ব দেয় নাই। তখন ডাক্তারও ছিল না। অবস্থা খারাপ থাকায় রোগীকে বাইরে নিয়ে সিজার করতে হয়েছে। এমতাবস্থায় সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে বাধ্য হয়ে প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে, ধার দেনা করতে গিয়ে এতে আমি অনেক অর্থ সংকটে ভুগছি। তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সমস্যাগুলো দ্রুত নিরসন করার আহ্বান জানান।

বিজ্ঞাপন
একজন নারীর স্বামী মো. নোমান বলেন, সরকারি হাসপাতালে ভরসা করে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখানে কোনো প্রকার গুরুত্বই দিল না তারা। রোগী গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় প্রাইভেটভাবে বাইরে চিকিৎসা নিতে হয়েছে। আমাাদের যেই ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। এরকম ঝামেলায় যেন অন্য কাউকে কোনোদিন পড়তে না হয়!
বাংলাদেশ প্রাইভেট হসপিটাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের জেলা সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহা. আবু হাসান বলেন, আমাদের প্রাইভেট হাসপাতালগুলোতে গুরুত্বসহকারে, সুন্দর পরিবেশে, দামি ইন্সট্রুমেন্ট দিয়ে উন্নত চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। এজন্য হয়ত মানুষ আমাদের এখানে আসে। তবুও আমরা আমাদের সাধ্য অনুযায়ী মধ্যবিত্ত মানুষকে ডিসকাউন্ট দিয়ে সেবা প্রদান করার চেষ্টা করি।

জেলা স্বাস্থ্য অধিকার ফোরামের সভাপতি সাংবাদিক হাসানুর রহমান ঝন্টু বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রসূতি মায়েদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কিছু কিছু সিজার বা নরমাল ডেলিভারি করে থাকলেও বেশিরভাগই বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে প্রাইভেট হসপিটালগুলোতে পাঠিয়ে থাকেন। এবং চিকিৎসা অবহেলা করেন, এমতাবস্থায় মধ্য নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষগুলোর খুবই দুরবস্থার মধ্যে কাটাতে হয়।
শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত সহকারী পরিচালক ডা. আলহাজ মো. ইউনূস মো. বলেন, সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল, সরঞ্জাম ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে অনেক স্বাভাবিক প্রসব ও অস্ত্রোপচার এখানেই করা সম্ভব। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তা হচ্ছে না। নিজেদের দায়িত্ববোধ থেকে কাজ করলে সবাইকে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সম্ভব।

২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, আমাদের এখানে সিজার ও নরমাল ডেলিভারি করা হয়। হাসপাতালে প্রসূতি মায়েদের সিজারের দিন এবং সময় নির্ধারিত অনুযায়ী চিকিৎসা সেবা চলমান থাকে। তবে সেগুলো আরও বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ চিকিৎসা সেবা দেওয়ার চেষ্টা করব আমরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে শক্ত নজরদারি, জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা এবং মাতৃস্বাস্থ্য সেবার প্রতি অগ্রাধিকার না দিলে অসচ্ছল গর্ভবতী নারীরা এমন ভোগান্তিতেই পড়ে থাকবেন এমন আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রতিনিধি/এসএস

