‘জন্ম থেকে থেকে প্রতিবন্ধী। সামান্য পাঁচ ক্লাস লেখাপড়া করিছি। আর এর পাশে একটু মক্তবে পড়িছি। বাপ-মা কতো কোনো কাজ কাম পারে না। ওর ভিক্ষে করে খাওয়া লাগবি। তো আল্লাহর কি ইশারায় সবাই মিলে মক্তবে পড়াইয়ছে। সেখান থেকে এটু আজান দেওয়া শিকিছিলাম। মেলা দিন ধইরি পাশের এক মসজিদে আজান দিই, ৩৫’শ টাকা বেতন পাই। আর বাপ নানাবাড়ির জমি বেচা টেকা দিয়ে একটা ভ্যান কিনে দিছিল। এই দিয়ে কোনোমতে চলছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় গত বৃহস্পতিবার ভ্যানটা চুরি হয়া গেছে। এখন খুব কষ্টে আছি।’
ভেজা চোখে কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার শারীরিক প্রতিবন্ধী যুবক মো. আরিফুল ইসলাম (৩২)। তিনি কুমারখালীর চাপড়া ইউনিয়নের ভাড়রা গ্রামের সাদেক আলী শেখের ছোট ছেলে। স্ত্রী মমতা খাতুন, দুই সন্তান আব্দুল্লাহ (৪) ও মরিয়ম (৬), বৃদ্ধ মা নোমেলা বেগম ও বাবা সাদেকসহ ছয়জনের সংসার তার। তিনি ধর্মপাড়া জামে মসজিদের মোয়াজ্জিনের পাশাপাশি ভ্যান চালিয়ে জীবিকার্জন করে থাকেন। গত ৮ জানুয়ারি মসজিদের সামনে ভ্যানটি রেখে মাগরিবের আযান দিচ্ছিলেন। আজান ও নামাজ শেষে এসে দেখেন তার ভ্যানটি নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটি না পেয়ে উপার্জনের একমাত্র অবলম্বন হারিয়ে দিশেহারা আরিফুল।
বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কুমারখালীর লাহিনীপাড়া-সান্দিয়ারা সড়ক ঘেঁষে ভাড়রা এলাকায় পাউবোর সরকারি জমিতে টিনশেড ও মাটির দেওয়ালের দুটি ঘর আরিফুলের। একটিতে আরিফুল তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বাস করেন। অপরটিতে থাকেন তার বড় ভাই। পাশের আরেকটি টিনের খুপড়ি ঘরে থাকেন বৃদ্ধ বাবা-মা। বছর দুয়েক আগে এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ করে একটি বড় টিনের চারচালা ঘর নির্মাণ করে ছাউনি দিলেও আজও দিতে পারেননি বেড়া।
বৃহস্পতিবার দুপুরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের চৌচালা ঘরের একটি বেড়া মাটির তৈরি। অন্য ঘরটির নেই দরজা, জানালা, বেড়া। সেখানে দেওয়া হতো চুরি যাওয়া ভ্যানটি। ভ্যানের চার্জার নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে আছেন শারীরিক প্রতিবন্ধী আরিফুল, তার স্ত্রী, বাবা-মা ও দুই সন্তান। তাদের চোখে মুখে হতাশার ছাপ।

বিজ্ঞাপন
এ সময় আরিফুল জানান, জন্ম থেকেই প্রতিবন্ধী। বাম পায়ে শক্তি পান না তিনি। সেজন্য ভারী কাজ করতে পারেন না। ব্যাটারিচালিত ভ্যানে অল্প যাত্রী নিয়ে চলাচল করে তিনি দিনে ২০০ -৩০০ টাকা আয় করতেন। পাশাপাশি ওই ভ্যানটি চালিয়েই পাঁচ ওয়াক্ত মসজিদে গিয়ে আযান দেন। এ কাজ থেকে তিনি মাসে তিন হাজার ৫০০ টাকা পান। এ সব দিয়ে কোনোমতে চলছিল তার ৬ সদস্যের সংসার।
তিনি আরও জানান, ঘটনার দিন মসজিদের সামনে ভ্যান রেখে মাগরিবের আযান দিচ্ছিলেন। পরে ফিরে এসে দেখেন ভ্যানটি আর নেই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ভ্যানটি না পেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন তিনি। সবার সহযোগিতায় আরেকটি ভ্যান কিনতে চান তিনি।
ভ্যানের কথা বলতেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে দেন আরিফুলের মা নোমেলা বেগম। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি প্যারালাইজড রোগী। প্রতিবন্ধী ছোঁয়ালের ভ্যানের টাকায় কোনোমতে খেয়ে পরে আছি। তাও চোর নিয়ে গেছে। মানুষ কয় কেজি চাল দিছে, তাই খাচ্ছি। মানষে আর কয়দিন দেব? তোমরা একটা ভ্যানের ব্যবস্থা করে দাও।

প্রতিবেশী আনিসুর রহমান জানান, প্রতিবন্ধী হয়ে ভিক্ষা না করে পরিশ্রম করে খেত আরিফুল। ভ্যান হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন আরিফুল। এলাকাবাসী কিছুটা সহযোগিতা করছে। তবে প্রশাসন বা বিত্তবানদের সহযোগিতা পেলে আবারও ঘুরে দাঁড়াবে পরিবারটি।
এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, নির্বাচনকালীন কারণে বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে লিখিত আবেদন করলে পরবর্তীতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন ইউএনও।
জরাজীর্ণ ঘরের সামনে হারিয়ে যাওয়া ভ্যানের চার্জার হাতে প্রতিবন্ধী আরিফুল ও তার পরিবার। ছবি বৃহস্পতিবার দুপুরে কুমারখালীর ভাড়রা গ্রামের।
প্রতিনিধি/এসএস

