নদীর ঢেউ যেমন নীরবে পাড় ভাঙে, কিছু জীবনগল্প তেমনি নীরবে ভেঙে দেয় সমাজের দীর্ঘদিনের পুরোনো দেয়াল। দিনাজপুরের খানসামা উপজেলার আঙ্গারপাড়া ইউনিয়নের নদীপাড়ে তেমনই এক গল্পের জন্ম হয়েছে। যেখানে নারীর জীবন মানেই ছিল রান্নাঘর আর সন্তানের দেখাশোনা সেই প্রথা ভেঙে রঙ-তুলিকে সঙ্গী করে নিজের এক অনন্য পরিচয় গড়েছেন ইতি পাটোয়ারী। তিনি কেবল একজন শিল্পী নন, বরং সাহসের রঙে আঁকা এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা।
চারপাশের সীমাবদ্ধতা কখনোই তার স্বপ্নকে আটকে রাখতে পারেনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে ‘প্রাচ্য চিত্রকলা ও মুদ্রণ শিল্পে’ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করা ইতি পাটোয়ারী এক শিক্ষক পরিবারের গৃহবধূ এবং দুই সন্তানের জননী। তার স্বামী আফজালুর রহমান পাকেরহাট সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। সংসার, সন্তান আর সামাজিক দায়িত্বের ভিড়েও ইতি নিজের শিল্পীসত্তাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন নিরলস সাধনায়।
বিজ্ঞাপন
২০২২ সালে আন্তর্জাতিক ফ্রিল্যান্সিং মার্কেটপ্লেস ‘ফাইভার’-এ কাজ শুরু করেন ইতি। তবে সময়ের কড়াকড়ি, বিদেশি ক্লায়েন্টদের চাপ এবং ছোট শিশুদের দেখাশোনার ব্যস্ততায় প্রতিদিনের পথচলা ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। তখনই তার মনে প্রশ্ন জাগে এই শিল্পীসত্তাকে কি নিজের সুবিধামতো সময়ে ও স্বাধীনভাবে বিকশিত করা যায় না?
সেই উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি ফিরে যান শৈশবের ভালোবাসার কাছে। ইউটিউব ও ফেসবুকে হ্যান্ডপেইন্ট ও হস্তশিল্পের ভিডিও দেখতে দেখতে রঙের প্রতি তার পুরনো টান আবার জেগে ওঠে। ধীরে ধীরে কাপড়ের ক্যানভাসে ছবি আঁকতে শুরু করেন তিনি। সেখান থেকেই রোপিত হয় নতুন এক স্বপ্নের বীজ।
২০২৩ সালের শুরুতে মাত্র চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু হয় তার উদ্যোগ ‘ইতি কথা’-র। কিছু কাপড়, রঙ আর রাসায়নিক দ্রব্য কিনে হাতে আঁকা কয়েকটি পোশাকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন তিনি। দ্রুতই আশাতীত সাড়া মেলে। অল্প সময়ের ব্যবধানে ‘ইতি কথা’ নামের ফেসবুক পেজটি হয়ে ওঠে তার স্বপ্ন ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম।
মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে চার হাজার টাকার পুঁজি আজ দাঁড়িয়েছে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার ব্যবসায়। বর্তমানে তার মাসিক আয় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। তবে আর্থিক সাফল্যের চেয়েও তার বড় অর্জন হলো স্বাবলম্বী হওয়ার আত্মবিশ্বাস।
বিজ্ঞাপন
ইতি পাটোয়ারীর প্রতিটি নকশায় কথা বলে বাংলার মাটি ও প্রকৃতি। আবহমান লোকজ ঐতিহ্য আর রঙের নান্দনিক মেলবন্ধনে তিনি তৈরি করেন হ্যান্ডপেইন্ট শাড়ি, থ্রি-পিস, শিশুদের পোশাক, পাঞ্জাবি, কাপল সেট ও ফ্যামিলি সেট। ঈদ, দুর্গাপূজা কিংবা বাংলা নববর্ষের মতো উৎসবগুলোতে তার কাজের চাহিদা থাকে তুঙ্গে।
নিজের সাফল্যেই থেমে থাকেননি ইতি পাটোয়ারী। তিনি বিশ্বাস করেন, স্বপ্ন তখনই পূর্ণতা পায় যখন তা অন্যের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া যায়। এ লক্ষ্যেই তিনি প্রায় ২৫ জন স্থানীয় নারীকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিয়ে নিজের দলে যুক্ত করেছেন। এই নারীরা আজ কেবল কর্মজীবী নন, বরং তারা আত্মমর্যাদার এক নতুন পরিচয়ে পরিচিত।
সংসার সামলানো, পণ্য তৈরি এবং অনলাইনে বিপণন সবই একা হাতে সামলান ইতি। এই বন্ধুর যাত্রায় তার প্রধান অনুপ্রেরণা ও শক্তির উৎস স্বামী আফজালুর রহমান। তার সহযোগিতা ও উৎসাহই ইতিকে প্রতিকূলতা জয়ের শক্তি যুগিয়েছে।

ইতি পাটোয়ারী বলেন, ‘আমার কাজগুলো কেবল পণ্য নয়, এগুলো আমার সৃষ্টি। স্বামীর সহযোগিতা না থাকলে দুই সন্তান সামলে একা এই কাজ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব ছিল। তার সমর্থন আর নিজের মনোবল নিয়েই আমি এগিয়ে যাচ্ছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আমার এই উদ্যোগকে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে দিতে চাই, যেন প্রান্তিক ও অবহেলিত নারীরা স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পায়।’
প্রতিনিধি/একেবি

