কচা নদীর তীর ঘেঁষে সারি সারি বাঁশের মাচা, বাতাসে ভেসে আসা শুকনো মাছের গন্ধ আর শ্রমিকদের কর্মব্যস্ত হাতের শব্দে দিনভর মুখর থাকে এই এলাকা। শীত এলেই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় শুঁটকি পল্লীটি। আর এই শুঁটকির আড়ালে নিষিদ্ধ হাঙর ও শাপলা মাছের শুঁটকি তৈরি করে বিক্রির জন্য পাঠানো চট্টগ্রামে।
পিরোজপুর সদর উপজেলার চিথলিয়া গ্রামের অবস্থিত শুঁটকি পল্লীটি। নদী ও বঙ্গোপসাগর কাছাকাছি হওয়ায় সদর উপজেলার পাড়েরহাটে একটি মৎস্য বন্দর গড়ে ওঠে। এই বন্দরের পাশেই চিথলিয়া গ্রামে শুঁটকি পল্লীর সূচনা। বন্দরে আসা সামুদ্রিক মাছ পাশাপাশি নিষিদ্ধ হাঙর ও শাপলা পাওয়া যায়, যা থেকেই তৈরি হয় শুঁটকি।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে দেখা মেলে নিষিদ্ধ হাঙর ও শাপলা মাছের শুঁটকি। একরাম নামের এক শ্রমিক মাছ কাটার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন এমন সময় ডলফিন আকারে রাখা মাছের স্তূপের ভিডিও করতে গেলে বাধা দিয়ে নিষেধ করেন ভিডিও করতে। তিনি জানান, এই মাছগুলো নিষিদ্ধ না কিন্তু প্রশাসন ঝামেলা করে ভাই ভিডিও কইরেন না। মাছগুলো হাঙর স্থানীয় মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র থেকে জেলেদের কাছ থেকে কিনে এনেছি।

এই হাঙরগুলো কোথায় যায় জানতে চাইলে তিনি বলেন, চিটাগং। সেখান থেকে বিদেশে যায় এবং পাহাড়িদের মাঝে বিক্রি হয়।
একই অবস্থা শুঁটকি পল্লীর সব কয়টি মালিকের শুঁটকি মাচায়। তারা হলেন, আলী সরদার, ইমাম ব্যাপারী, মো. সেলিম, লতিফ সরদার।
বিজ্ঞাপন

সবার থেকে দূরে কাদা মাড়িয়ে লতিফ সরদারের মাচায় গেলে দেখা যায় একই অবস্থা। ভিডিও করা শুরু করলে লতিফ ও তার ভাই পরিচয়ে এসে বলেন, এগুলোর ভিডিও করবেন না, প্রশাসন সমস্যা করে। অনেক বছর আগে একবার প্রশাসনের হাতে আটকও হয়েছি। একবার এই নদী পাড়ি দিয়ে ওপারে পালিয়েছি।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, অসাধু জেলে ও ব্যবসায়ীরা এর সঙ্গে জড়িত। তারা লাভের আশায় এই বিপন্ন প্রায় এই বন্যপ্রাণী ধ্বংস করছে। হাঙর বছরে ১৫-২০টি বাচ্চা দেয় তাই এই প্রাণী অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখতে এর ব্যাপারে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসন ও বনবিভাগ, মৎস্য, কোস্টগার্ড এরদের নজরদারি রাখতে হবে।
এ ব্যাপারে পিরোজপুর বনবিভাগের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা চিন্ময় মধু জানান, বণ্যপ্রাণীর এই বিভাগটা খুলনা রেঞ্জ দেখে। আমি ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলে দেখব মোবাইল কোর্ট দেওয়া যায় কিনা।

এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা সঞ্জীব সন্নামত জানান, এ বছর আমরা এখনও ভিজিট করিনি। আমার এ ব্যাপারে জানা নাই। যদি এমন কিছু হয়ে থাকে তাহলে ব্যবস্থা নেব।
উল্লেখ্য, দেশে প্রথমবারের মতো হাঙরের সুরক্ষার বিষয়টি উঠে আসে ২০১২ সালের বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে। সে সময় হাঙরের ১৮ প্রজাতিকে রক্ষিত প্রাণীর তালিকায় আনা হয়। তবে এরপরও থামানো যায়নি হাঙর ধরা।

২০২১ সালে সেপ্টেম্বর মাসে হাঙরকে বিপন্ন প্রাণী হিসেবে তালিকাভুক্ত করে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)। ওই বছর ২২ সেপ্টেম্বর আগের তফসিল সংশোধন করে মোট ২৮ প্রজাতির হাঙরকে সুরক্ষার তালিকায় আনা হয়। তবে এরপরও বন্ধ হয়নি হাঙর শিকার।
প্রতিনিধি/এসএস

