সবুজে মোড়ানো ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) ক্যাম্পাস প্রতিদিন নতুন স্বপ্নের জন্ম দেয়। ক্লাসরুম, টিউটোরিয়াল, লাইব্রেরি কিংবা বিকেলের চায়ের আড্ডায় গড়ে ওঠে অসংখ্য গল্প। কিন্তু ২০২৫ সাল সেই গল্পগুলোর অনেককেই অসমাপ্ত করে দিয়েছে। এই এক বছরে ইবি হারিয়েছে একাধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাকে—যাদের শূন্যতা আজও তীব্রভাবে অনুভূত হয় বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে।
চলে যাওয়া মানুষগুলো আর ফিরবেন না ক্লাসে কিংবা অফিসকক্ষে। তবু তাদের স্মৃতি, স্বপ্ন আর জীবনের ছাপ রয়ে গেছে সহপাঠী, সহকর্মী ও পুরো বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের হৃদয়ে।
বিজ্ঞাপন

২০২৫ সালের সবচেয়ে আলোচিত ও হৃদয়বিদারক ঘটনাগুলোর একটি ছিল আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাজিদ আব্দুল্লাহর মৃত্যু। গত ১৭ জুলাই শাহ আজিজুর রহমান হলের পুকুর থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর দেহ। পরবর্তী সময়ে ভিসেরা রিপোর্টে শ্বাসরোধে মৃত্যুর তথ্য সামনে আসে। ৪ আগস্ট তার বাবা হত্যা মামলা দায়ের করেন, যা পরে সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। মৃত্যুর পাঁচ মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনও শনাক্ত হয়নি ঘাতকরা। ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছেন তার পরিবারসহ হাজারও ইবিয়ান।

একই বছরে সড়ক ও নৌদুর্ঘটনাও কেড়ে নিয়েছে সম্ভাবনাময় তরুণদের প্রাণ। বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী মাসুদা মাহজাবিন মৌ ও তার স্বামী হৃদয় হোসেন ৫ এপ্রিল পদ্মা নদীতে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারান। নবদম্পতির এই মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে শোকস্তব্ধ করে তোলে। অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই নৌকার কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে বলে জানা যায়।
বিজ্ঞাপন

সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৮–১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী রাশেদুল ইসলাম। সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করে ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি। ১৬ জুন কুষ্টিয়া থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে বাস ও ট্রাকের সংঘর্ষে তার মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ রোগভোগের পর বিদায় নিয়েছেন আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী। ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া শারমিন শান্তা লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ভারতের রেলা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। লিভার ট্রান্সপ্লান্টের পর আর জ্ঞান ফেরেনি তার। ২১ জুন রাতে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। একইভাবে হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য পদ্ধতি বিভাগের শিক্ষার্থী উত্তম কুমার রায় দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভুগে ১৬ জুলাই মৃত্যুবরণ করেন। বন্ধুদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে হার মানতে হয় জীবনসংগ্রামে।

ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে বিদায় নেন আল হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী আবুল কাশেম। ৯ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। মৃত্যুকালে স্ত্রী ও এক বছরের সন্তান রেখে যান এই তরুণ শিক্ষার্থী।

পূজার ছুটিতে বাড়ি গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন সমাজকল্যাণ বিভাগের শিক্ষার্থী দেবতোষ সরকার দিব্য। আহত অবস্থায় ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হলে ৩০ অক্টোবর সকালে তার মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, চিকিৎসায় অব্যবস্থাপনা তার মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে।

শুধু শিক্ষার্থী নয়, এই বছর ইবি হারিয়েছে অভিভাবকতুল্য শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও। বার্ধক্যজনিত কারণে ৪ নভেম্বর মারা যান আল কুরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইয়াহিয়া রহমান। একই বছর ১৩ জুন ব্রেইন স্ট্রোকে মৃত্যুবরণ করেন একাডেমিক শাখার উপ-রেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তা সমিতির সভাপতি মো. দেওয়ান টিপু সলতান।

এর আগে, কুষ্টিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৯ ফেব্রুয়ারি মারা যান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ ও হিসাব বিভাগের সহকারী রেজিস্ট্রার মোছা. ইশরাত জাহান লাবনী। এই মানুষগুলো আজ আর নেই। তবু তাদের হাসি, স্বপ্ন, সংগ্রাম আর উপস্থিতির স্মৃতি ছড়িয়ে আছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি করিডোরে, প্রতিটি ক্লাসরুমে। ইবি পরিবারের কাছে তারা হয়ে থাকবেন হারানো আলো-যারা স্মৃতিতে অমলিন, চিরকাল।
প্রতিনিধি/এসএস

