নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় সাবমারসিবল পাম্প স্থাপনে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। এক বছরের বেশি সময় পার হলেও কাজ শেষ না করেই কাগজে-কলমে বাস্তবায়ন দেখিয়ে প্রকল্পের প্রায় পুরো বিল তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মাসের পর মাস সংশ্লিষ্ট দফতরে ঘুরেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না সুবিধাভোগী পরিবারগুলো।
হাতিয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলীর কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় উপজেলায় ১৪৪টি আর্সেনিকমুক্ত সাবমারসিবল পাম্প বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসব পাম্প স্থাপনের কাজ পায় মেসার্স মোজাহারুল ইসলাম ও মেসার্স মাহমুদুর রহমান নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
এর মধ্যে ৭২টি পাম্প স্থাপনের দায়িত্ব পায় মেসার্স মোজাহারুল ইসলাম। এক কোটি ১৬ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮৭ টাকার এই কাজটি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অনিয়মের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
নিয়ম অনুযায়ী, প্রান্তিক পর্যায়ের পরিবারগুলো ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারি ফি বাবদ ১০ হাজার টাকা জমা দিয়ে প্রকল্পের সুবিধাভোগী হন। এরপর সুবিধাভোগীদের নির্ধারিত স্থানে সাবমারসিবল পাম্প স্থাপন, ৫ ফুট উচ্চতার পাকা হাউজে পানির ট্যাংক বসানো, নিচে ৪ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৫ ফুট প্রস্থের পাকাকরণ, একটি ডিস্ট্রিবিউশন চেম্বার স্থাপন এবং মানসম্মত ১ হর্স মোটরসহ সব মালপত্র সংযোজন করে ব্যবহার উপযোগী করার কথা। কার্যাদেশ পাওয়ার ১৮০ দিনের মধ্যে এসব কাজ সম্পন্ন করে উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশল কার্যালয়ের প্রত্যয়ন সাপেক্ষে ঠিকাদারের বিল পরিশোধের বিধান রয়েছে।
কিন্তু মেসার্স মোজাহারুল ইসলামের স্বত্বাধিকারী সৌরভ ইসলাম জসি এসব নিয়মের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে পাম্পগুলো স্থাপন করেছেন। প্রতিটি সুবিধাভোগী পরিবার থেকে শ্রমিকদের খাওয়া খরচের নামে সাড়ে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। পাম্প স্থাপনে তিনটি করে ফিল্টার দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হচ্ছে দুটি, আর তৃতীয়টির নামে সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা করে আদায় করা হয়েছে। পাশাপাশি ভালো মানের মোটরের পরিবর্তে ‘লীরা’ নামের একটি বেনামি কোম্পানির মোটর চিকন সুতা দিয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে, যা অল্প সময়ের মধ্যেই অকার্যকর হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সুবিধাভোগীরা।
২০২৫ সালের ২০ জানুয়ারি কার্যাদেশ পাওয়ার পর এক বছর পেরিয়ে গেলেও পাম্প স্থাপনের পরবর্তী ট্যাংক বসানো, প্ল্যাটফর্ম ও পাকাকরণসহ কোনো কাজই সম্পন্ন করা হয়নি।
দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে কাগজে-কলমে কাজ শেষ দেখিয়ে প্রকল্পের অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে। কাজ না করেই প্রায় পুরো বিল উত্তোলন করে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি।
চরকিং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী রাকিবুল হাসান জানান, পাম্প স্থাপনের সময় শ্রমিকদের খাওয়া খরচের নামে তার কাছ থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়। পরে একটি ফিল্টারের জন্য আরও ৭০০ টাকা আদায় করা হয়। বেনামি কোম্পানির মোটর চিকন সুতা দিয়ে সংযুক্ত করতে চাইলে তিনি নিজ খরচে বাজার থেকে ৭০ ফুট তার কিনে এনে স্থাপন করাতে বাধ্য হন।
একই অভিযোগ করেন বুড়িরচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী অলি উদ্দিন। তিনি জানান, খাওয়া খরচের নামে তার কাছ থেকে চার হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে এবং আরও নানা অজুহাতে টাকা আদায় করা হয়েছে। পাম্প স্থাপন করা হলেও এখনো পানির ট্যাংক বসানোসহ বাকি কাজ হয়নি।
এ ধরনের অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। চরকিং ইউনিয়নের খাসের হাট জামে মসজিদে স্থাপিত সাবমারসিবল পাম্পে দেড় হর্সের মোটর ও ডিস্ট্রিবিউশন চেম্বার বসানোর কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ১ হর্সের মোটর এবং ডিস্ট্রিবিউশন চেম্বার স্থাপন করা হয়নি। ফলে মসজিদ কর্তৃপক্ষ কাজ সম্পন্নের প্রত্যয়ন দেয়নি বলে জানান মসজিদের মুয়াজ্জিন জহিরুল ইসলাম। অথচ কাগজে-কলমে কাজ সম্পন্ন দেখানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার সৌরভ ইসলাম জসির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
অন্যদিকে মেসার্স মাহমুদুর রহমানের আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পের বিষয়ে হাতিয়া পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সুবিধাভোগী মো. ইরান জানান, তার এলাকায় পাম্পটি সঠিকভাবে স্থাপন করা হয়েছে এবং সরকারি ফি ছাড়া তার কাছ থেকে কোনো অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হয়নি।
হাতিয়া উপজেলা জনস্বাস্থ্য উপ-সহকারী প্রকৌশলী এমদাদ হোসেন বলেন, প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করার জন্য দফতর থেকে চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
নোয়াখালী জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবিব ঢাকা মেইলকে জানান, মেসার্স মোজাহারুল ইসলামের স্বত্বাধিকারীর কাছ থেকে কাজ আদায় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করেন এবং প্রায় সব জায়গাতেই একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিনিধি/ক.ম

