আগের তুলনায় সব খাতে এগিয়ে চট্টগ্রাম বন্দর২০২৫ সালে সবকটি প্রধান সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর। এই এক বছরে কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং, জাহাজ চলাচল, রাজস্ব আয় এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণ—সব ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে।
বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) এমন তথ্য জানিয়েছেন চট্টগ্রাম বন্দরের পরিচালক (প্রশাসন) ওমর ফারুক। তিনি জানান, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নানামুখী চাপের মধ্যেও ঘুরে দাঁড়িয়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর।
বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে মোট ৩৪ লাখ ৯ হাজার ৬৯ টিইইউএস কনটেইনার, ১৩ কোটি ৮১ লাখ ৫১ হাজার ৮১২ মেট্রিক টন কার্গো এবং ৪ হাজার ২৭৩টি জাহাজ হ্যান্ডলিং করা হয়েছে—যা বন্দরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
ওমর ফারুক জানান, ২০২৫ সালে বন্দরের রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ হাজার ৪৬০ কোটি ১৮ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৫৫ শতাংশ বেশি। এ বছর চট্টগ্রাম বন্দর সরকারকে ১ হাজার ৮০৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা রাজস্ব দিয়েছে।
এ ছাড়া বন্দর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনতে অনলাইন ই-মুট পাস, অনলাইন বিল জেনারেশন ও ই-পেমেন্ট ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক দিনেই সর্বোচ্চ ৬ হাজার ৭৬১টি ই-মুট পাস ইস্যু করা হয়।
সার্বিক ব্যবস্থাপনায় চট্টগ্রাম বন্দরে আগের বছরের তুলনায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, কার্গো হ্যান্ডলিংয়ে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ এবং জাহাজ হ্যান্ডলিংয়ে ১০ দশমিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ওমর ফারুক বলেন, ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত তথ্য আমাদের হাতে এসেছে—যা বিগত বছরের চেয়ে বেশি এবং রেকর্ডও। আশা করি ২০২৫ সালে বন্দরের হ্যান্ডলিংয়ের চূড়ান্ত তথ্য আগামীকাল পেয়ে যাব।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এই অগ্রগতি আধুনিক সরঞ্জাম সংযোজন ও ইয়ার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি, অটোমেশন, আধুনিক হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট সংযোজন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, কর্মীদের প্রশিক্ষণ, নতুন নতুন ইয়ার্ড, টার্মিনাল, জেটি, শেড নির্মাণ, সংস্কার, অপারেশন ও নিলাম প্রক্রিয়া দ্রুততর করাসহ বহুমুখী উদ্যোগের ফলে সম্ভব হয়েছে।
জাহাজ ব্যবস্থাপনায় উন্নতির ফলে ২০২৫ সালে বিভিন্ন সময়ে একাধিক দিন বন্দরে জাহাজের ওয়েটিং টাইম শূন্য ছিল। এতে বিগত বছরের তুলনায় সব খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। এ অর্জনে সরকার, মন্ত্রণালয়, বন্দর কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি বন্দরের শ্রমিক–কর্মচারী ও বন্দর ব্যবহারকারীরা অংশীদার বলে মত প্রকাশ করেন ওমর ফারুক।
বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে জাহাজের গড় টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম ছিল ২ দশমিক ৫৩ দিন এবং কনটেইনার ডুয়েল টাইম ছিল ৯ দশমিক ৪৪ দিন।
চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) পরিচালিত টার্মিনালগুলোতেও ১০ দশমিক ১৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে, যার মধ্যে অক্টোবর মাসে সর্বোচ্চ ২০ দশমিক ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করা হয়।
২০২৫ সালে ৩৪ লাখের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আগের বছর যা ছিল ৩২ লাখ ৭৫ হাজার ৬২৭ টিইইউএস (২০ ফুট দীর্ঘ)। এবার প্রায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
গত জানুয়ারি থেকে ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট জাহাজ হ্যান্ডলিং হয়েছে ৪ হাজার ২৬৭টি—আগের বছর যা ছিল ৩ হাজার ৮৬৭টি। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি প্রায় সাড়ে ১০ শতাংশ।
গত ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩১ হাজার ৮৬৪ মেট্রিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করেছে—গত বছর যা ছিল ১২ কোটি ৩৯ লাখ ৮৩ হাজার ১৪ টন। প্রবৃদ্ধি প্রায় সওয়া ১১ শতাংশ।
বন্দর সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ৭ জুলাই থেকে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী পরিচালিত চিটাগাং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এর মধ্য দিয়ে এনসিটিতে বেসরকারি সাইফ পাওয়ারটেক লিমিটেডের প্রায় দেড় যুগের পরিচালনার অবসান ঘটে।
এর আগে বিভিন্ন দাবিতে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদের ডাকা কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির কারণে চলতি বছরের ২৮ জুন থেকে দুই দিন চট্টগ্রাম কাস্টমসে সব ধরনের কাজ বন্ধ ছিল। শুল্কায়নের পর কাস্টমস নথি ছাড় না করায় ওই সময় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আমদানি পণ্য নিয়ে কোনো কনটেইনার বের হওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।
একইভাবে বেসরকারি ডিপো থেকে রপ্তানি পণ্য নিয়ে কনটেইনার বন্দরে প্রবেশও বন্ধ হয়ে যায়। তিন দিনের মাথায় কাস্টমস সচল হলেও বন্দরে অচলাবস্থা থেকে যায় আরও কয়েক দিন। এর ফলে বন্দরের ইয়ার্ডে কনটেইনার জট তৈরি হয়।
মাশুল বাড়ানোর পর গত অক্টোবরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সব ধরনের আমদানি পণ্য পরিবহন একযোগে বন্ধ করে দেয় পরিবহন মালিক–শ্রমিক সংগঠনগুলো। এতে বন্দর থেকে আমদানি পণ্য বের হওয়া পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। রপ্তানি পণ্য বন্দরে প্রবেশেও ব্যাঘাত ঘটে। এ অচলাবস্থাও প্রায় দুই দিন অব্যাহত ছিল, যাতে বন্দরে প্রায় ৪৬ হাজার কনটেইনারের জট সৃষ্টি হয়।
তারপরও তিনটি পদক্ষেপে বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম গতিশীল হয়েছে। অবকাঠামোগত উন্নয়ন যেমন হয়েছে, তেমনি বন্দর ব্যবহারকারীদের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে সময়োপযোগী নীতিমালাও করা হয়েছে। এতে বন্দরের সক্ষমতা বেড়েছে।
বন্দর ব্যবহারকারীদের ভাষ্য, ঝড়–বৃষ্টি–রোদ থেকে বাঁচিয়ে পণ্যের গুণগত মান রক্ষা, সহজে জাহাজে তোলা ও নামানো, বন্দর থেকে কারখানা বা অফডকে আনা–নেওয়ার সুবিধার কারণে মেরিটাইম বিশ্বে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন জনপ্রিয় হচ্ছে। তাই কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর আধুনিক বন্দরগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে। প্রায় সব ধরনের পণ্যই কনটেইনারে পরিবহন করা হয়।
তবে সিরামিক, সিমেন্টসহ বিভিন্ন শিল্পের অধিক পরিমাণে আমদানি করা কাঁচামাল ও খাদ্যশস্য এখনো কার্গো জাহাজে আনা হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী নদীর চ্যানেল ও জেটি এলাকায় গভীরতা কম থাকায় এসব বড় জাহাজ সরাসরি ভিড়তে পারে না। গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ বড় জাহাজের পাশে ছোট জাহাজ (লাইটার) ভিড়িয়ে খালাস করে গন্তব্যে নেওয়া হয়।
এ ক্ষেত্রে ইউএস কোস্ট গার্ডের পরিদর্শনে ইতিবাচক স্বীকৃতি পাওয়ায় বন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অর্জন করেছে। অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ৭০ হাজার বর্গমিটার ইয়ার্ড নির্মাণ ও নতুন হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট সংগ্রহ করা হয়েছে।
পাশাপাশি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ও ১৩ হাজার ৫২৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা ব্যয়ের বে-টার্মিনাল প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম বন্দর একটি আঞ্চলিক ট্রান্সশিপমেন্ট হাবে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, বিশ্বের সেরা ১০০ কনটেইনার হ্যান্ডলিংকারী বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ৬৮তম। ২০২৪ সালের কনটেইনার পরিবহনসহ বিভিন্ন সূচকের প্রেক্ষিতে এ তালিকা প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক শিপিংবিষয়ক বিশ্বের সবচেয়ে পুরোনো সংবাদমাধ্যম লয়েডস লিস্ট।
তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে চীনের সাংহাই। তালিকায় ভারতের মুন্দ্রা বন্দরের অবস্থান ২৪তম থেকে এক ধাপ কমে ২৫তম এবং জওহরলাল নেহরু বন্দর ২৭তম অবস্থান থেকে ৩১তম হয়েছে।
এআর

