দেবতাখুম নিয়ে প্রচলিত লোককাহিনি

সুফল চাকমা বান্দরবান
প্রকাশিত: ০৯ জুলাই ২০২২, ০৩:৩৮ পিএম
দেবতাখুম নিয়ে প্রচলিত লোককাহিনি
ছবি: ঢাকা মেইল

বান্দরবানের অন্যতম আকর্ষনীয় পর্যটন এলাকা ‘দেবতাখুম।’ স্থানীয়দের বিশ্বাস সৎদেবতারা সেখানে বাস করেন! জেলা সদর থেকে ৩৩ কিলোমিটার (কি.মি.) এবং রোয়াংছড়ি সদর উপজেলা থেকে ১৩ কি.মি. দূরে আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের চাগালা ওয়া রোয়া পাড়ার কাছে এই পর্যটন এলাকাটির অবস্থান।

বান্দরবান জেলা সদর থেকে চাঁদের গাড়িযোগে ৪০ মিনিটে পৌঁছানো যায় কচ্ছপতলী। সেখান থেকে পাহাড় বেয়ে অথবা যাদের পাহাড় ওঠা-নামায় ভয় আছে, তারা অনায়াসে তারাছা খাল হয়ে পায়ে হেঁটে ১ ঘণ্টায় পৌঁছাতে পারবেন দেবতাখুম। 

জায়গাটি নিয়ে স্থানীয়দের নানা বিশ্বাস এবং লোক কাহিনীও প্রচলিত আছে। স্থানীয় মেসেবু মার্মা (৫৩) নামের একজনের ভাষ্য— তার বড় ছেলে উমং সাইন (৩০) দেবতাখুম এলাকায় মদ খেয়ে মাতলামী করার পর গুরুতর অসুস্থ হয়েছিলেন। হাত-পা পুরোপুরি ঠান্ডা কোনো সাড়া-শব্দ নাই। শরীরে শুধু একটু একটু প্রাণের স্পন্দন ছিল। পাড়ার মুরুব্বীদের পরামর্শে রাত ১০টায় স্বামী-স্ত্রী মিলে বিভিন্ন ফুল-ফলমূল নিয়ে দেবতাখুমের দেবতার কাছে ছেলের হয়ে ক্ষমা চেয়েছিলেন। তারপরের দিন থেকেই সুস্থ হয়েছিলেন তার ছেলে উমং সাইন। তখন থেকে গ্রামের কেউ দেবতাখুমে গিয়ে কোনো খারাপ কাজ করেন না। শুধু রাতে নয় দিনের বেলায়ও গ্রামের কেউ একা একা দেবতাখুমে যান না বলে জানান মেসেবু মার্মা।
DEBOTAKHUMমিসেস মাসেই উ মার্মা (৩৮) নামের আরেকজনের ভাষ্য— তার পরলোকগত দাদা সুইচিং প্রু মার্মা বেঁচে থাকতে দেবতাখুম নিয়ে বিভিন্ন অলৌকিক-মিরাকল জাতীয় কাহিনী বলতেন। যেমন দেবতাখুমে কোনো একটা জায়গায় হঠাৎ জোরে জোরে বুদ বুদ হয়ে পানি উদগীরণ হয়ে উপচে পড়ে। কিংবা হঠাৎ দেবতাখুমের মাঝখানে বিশালকায় কচ্ছপ ভেসে উঠে বিভিন্ন ধরণের মিরাকল, অলৌকিক ক্ষমতা দেখায়। আর ওখানে কেউ যদি মাছ ধরতে যায়, মাছ ধরা শুরু করার আগে দেবতার উদ্দেশে বিভিন্ন ফুল ও ফল দিয়ে পূজা করে দুয়েক-বেলা মাছ পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করে মাছ ধরা শুরু করেন। আবার একই ব্যক্তি যদি দুয়েকদিন পর পর ফুল-ফল দিয়ে পূজা করে মাছ পাওয়ার জন্য প্রার্থনা করলে তাও আবার স্বচ্ছ পানিতে মাছ  দেখা যাবে। কিন্তু জাল দিয়ে মাছ ধরতে চাইলে মাছ জালে ধরা পড়বে না।
DEBOTAKHUMচাগালা ওয়া রোয়া গ্রামবাসীদের মুখে মুখে দেবতাখুমের এরকম অসংখ্য অলৌকিক ঘটনা, মিরাকল ও বিশ্বাসের কাহিনী প্রচলিত রয়েছে। তাদের বিশ্বাস দেবতাখুমে সৎ দেবতারা বসবাস করেন। সেখানে খারাপ কিছু করা যাবে না। করলে নিজের ক্ষতি হবে অমঙ্গল হবে বলেও দৃঢ় বিশ্বাস স্থানীয়দের।

দেবতাখুম ঘুরে দেখার জন্য ৫টি নৌকা ও ৩০টির অধিক বাঁশের ভেলা আছে। পর্যটকদের কাছে দেবতাকুম পরিদর্শন ফি হিসেবে যে টাকা পাওয়া যায় তাই দিয়ে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া হয়। পর্যটকদের দেখভাল করার জন্য সার্বক্ষনিক ৬ জন কর্মচারী নিয়োজিত আছেন। তাদের প্রতিজনের বেতন মাসিক ১৫ হাজার টাকা। 

অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি প্রতিদিন কমপক্ষে ১ শ টিম পর্যটক দেবতাখুমে আসেন। পর্যটকদের প্রতিটি টিমে ৪ থেকে ১০০ জন পর্যন্ত থাকেন বলে জানান ট্যুরিস্ট গাইড উনুসিং মার্মা (২৬)। তালিকাভুক্ত গাইড আছেন ১৩০জন। দেবতাখুমে আগত পর্যটকদের সার্বিক দেখাশোন ও ঘুরে দেখানোর বিনিময়ে প্রতিজন গাইড দৈনিক ১ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। দেবতাখুমের পাশেই রয়েছে দুটি দোকান। ইচ্ছে করলে ভাতের অর্ডার করে সদলবলে সেখানে ভুরিভোজ করতে পারেন।
DEBOTAKHUM৬ বছর ধরে পর্যটকদের গাইড করে আয় যা হয় তা দিয়ে ৪ জনের পরিবারের ভরণপোষন করছেন বলে জানান গাইড আপন তঞ্চঙ্গ্যা (৩৬)। তার পরিচালনায় দেবতাখুম ঘুরতে বোয়ালখালী চট্টগ্রাম থেকে আজাদ, টুটুল ধরসহ (৩৫) এসেছেন ২৬ জনের একটি টিম। পর্যটক টুটুল ধর বলেন, এবার নিয়ে দ্বিতীয়বার এখানে আসা। প্রথমবার খুব ভালো লেগেছিল তাই আজ ২৬ জনের টিম নিয়ে এসেছি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেবতাখুম দেখতে। 

দেবতাখুম শত শত বছরের হলেও পর্যটনের স্থান হিসেবে ২০১৮ সাল থেকেই মূলত প্রচার পেয়েছে। স্থানীয় মার্মা অধিবাসীরা বলে নাই অইং, বাংলা ভাষায় রুপান্তর করলে দেবতাকুম ।  

বছরজুড়ে অসংখ্য পর্যটকের আনা-গোনা থাকে তবে অক্টোবর-ফেব্রুয়ারি মাসে বেশি পর্যটক দেবতাখুম ভ্রমণ করেন বলে জানান নৌকাচালক হ্লাথোয়াই চিং মার্মা। প্রথমে দেড়শ টাকায় পর্যটকদের নাম এন্ট্রি করতে হবে। দেবতাখুমে তার বিনিময়ে নৌকা ও বাঁশের ভেলা ব্যবহার করার সুযোগ পেয়ে থাকেন পর্যটকেরা।
DEBOTAKHUMনু চ মং মার্মার নেতৃত্বে পর্যটন এলাকা দেবতাখুমে একটি পরিচালনা কমিটি আছে। তিনি বলেন, দেবতাখুমের গভীরতা ৭০-৮০ ফুট। তাই প্রত্যেক পর্যটকের লাইফ জ্যাকেট পরিধান করা বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে দেবতাখুম ঘুরতে আসা পর্যটকদের সার্বিক নিরাপত্তাসহ যাবতীয় সেবা প্রদান করা হয়ে থাকে বলে জানান তিনি। 

রোয়াংছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. খোরশেদ আলম চৌধুরী বলেন, উপজেলার বিভিন্ন আকর্ষনীয় পর্যটন স্পটে বছরজুড়েই পর্যটকদের আগমন ঘটে, সেজন্য উপজেলা প্রশাসনের সবসময় সজাগ দৃষ্টি থাকে। যাতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত পর্যটকেরা দর্শনীয় স্থানসমুহ ঘুরে নিরাপদে ফিরে যেতে পারেন।

প্রতিনিধি/এএ