সারাদেশের মতো ঝালকাঠিতেও পহেলা ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হবার কথা ছিল। শিক্ষকদের আন্দোলনের কারণে অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বার্ষিক পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে। একারণে প্রাথমিক শিক্ষায় বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসেরও আশঙ্কা করেছেন অভিভাবকরা। সদর উপজেলার বহু বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকদের নিজস্ব উদ্যোগে সীমিত পরিসরে পরীক্ষা নেওয়া হলেও নলছিটি, রাজাপুর ও কাঁঠালিয়ার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পরীক্ষা বর্জন ও কক্ষ তালাবদ্ধ থাকায় পরীক্ষা অনুষ্ঠিতই হয়নি। আবার অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা নিজেদের ইচ্ছেমতো প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখেছে। এ পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। আর শিক্ষকরা বলছেন—লিখিত প্রজ্ঞাপন ছাড়া আন্দোলন বন্ধ করার কোনো সুযোগ নেই।
সদর উপজেলার উদ্বোধন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মিলন মন্দির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষকরা পিওন ও সহকারী অন্যান্য কর্মচারীদের সহায়তায় পরীক্ষা নেওয়ার কার্যক্রম চালাচ্ছেন। অন্যদিকে, আন্দোলরত অন্যান্য শিক্ষক কর্মবিরতি পালন করছেন।
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে নলছিটি, কাঠালিয়া এবং রাজাপুর উপজেলায় চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। সকাল থেকেই বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ের গেটে তালা ঝুলার খবর পাওয়া গেছে। রাজাপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে এসে অভিভাবকরা পরীক্ষা না হওয়ার বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শিক্ষিকা মাহমুদা বেগমের নেতৃত্বে শিক্ষকরা ক্লাস ও পরীক্ষা পুরোপুরি বন্ধ রেখেছেন। সকালে বাচ্চারা খাতা–কলম নিয়ে স্কুলে এসেছে, কিন্তু গেটে তালা দেখতে পায়।
শিক্ষক আন্দোলনের নেতাদের দাবি, সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণ, চাকরির নির্দিষ্ট সময় শেষে উচ্চতর গ্রেড নিশ্চিত করা এবং প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ বিভাগীয় পদোন্নতির বিষয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে। আন্দোলনকারীরা বলছেন, মৌখিক আশ্বাস দিয়ে সমস্যা এড়ানো যাবে না।
তারুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সালাউদ্দিন সোহাগ বলেন, ২০ দিন ধরে আমরা শুধু আশ্বাসই শুনছি। কিন্তু কোনো লিখিত প্রজ্ঞাপন নেই। শিক্ষক সমাজের ন্যায্য মর্যাদা নিশ্চিত না হলে আমরা পিছু হটতে পারি না। পরীক্ষা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত শিক্ষক সমাজ সহজে নেয়নি; তবে দাবি আদায়ের নিশ্চয়তা না থাকলে আন্দোলন দীর্ঘ হবে।
বিজ্ঞাপন
অভিভাবক সালেহ হাসান বলেন, এভাবে পরীক্ষার দিন সকালে তালা দেখে ফিরে আসতে হবে—এটা কল্পনাও করিনি। শিক্ষকরা আন্দোলন করবেন—সেটা তাদের অধিকার; কিন্তু আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কেন এতে জড়িত হবে।
পূর্ব কূলকাঠি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের দাবি পূরণ না হওয়ায় আজকে আমরা পরীক্ষা বর্জন করেছি। দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই কর্মসূচি চলবে।
শাহী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুরুন্নাহার বেগম বলেন, আমরা শিশুর ভবিষ্যৎ ভেবে পরীক্ষা নিয়েছি। তবে স্থায়ী সমাধান কেবল লিখিত নির্দেশনা ও প্রশাসনিক সমন্বয়েই সম্ভব।
প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সদর উপজেলার সভাপতি ও দিয়াকুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, শিক্ষকদের ন্যায্য দাবির আন্দোলনের পক্ষে আমি। তবে আমার সংগঠনের কোনো নির্দেশনা না থাকায় আমরা পরীক্ষা চালিয়ে নিয়ে নিয়েছি।
সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মো. রফিকুল ইসলাম তালুকদার বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য আমরা চেষ্টা করছি। সদর উপজেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শিক্ষকদের অনেক দাবি যুক্তিসঙ্গত হলেও বার্ষিক পরীক্ষার দিনে কর্মবিরতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। একই জেলার মধ্যে কোথাও পরীক্ষা হচ্ছে, কোথাও সম্পূর্ণ বন্ধ—এটি প্রশাসনিক সমন্বয়ের ঘাটতিকে আরও স্পষ্ট করে তুলবে বলে মনে করেছেন স্থানীয়রা।
প্রতিনিধি/টিবি

