তখন হেমন্তের কুয়াশায় মোড়া সকাল। প্রকৃতি যেন নিজেই ঢেকে রেখেছে নিজেকে ঘুমঘুম আবেশে। গাছপালা, পথঘাট, ঘরবাড়ি-সবকিছু নিঃশব্দে বিশ্রাম নিচ্ছে। বাতাসে ভাসছে এক ধরনের কোমল উদাসীনতা। শুকনো পাতারা মৃদু হাওয়ায় দুলে দুলে মাটিতে ঝরে পড়ছে, যেন ঋতুর পালাবদলের নরম কবিতা।
সম্প্রতি এক ভোরে মৌলভীবাজারের কাউয়াদীঘি হাওরের পথে যেতে যেতে হঠাৎই চোখ আটকে গেল খোলা এক মাঠে। যেখানে প্রকৃতি নিজ হাতের তুলির টানে এঁকেছে লালের অপার মাধুর্য। যেন জলজ বুকে খেলছে রঙের ঢেউ। হাওরের কালচে জলে ভেসে থাকা সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ফুটে থাকা লাল শাপলাগুলো নিজের রূপেই কথা বলে। মসৃণ ঘাসের আড়ালে দাঁড়িয়ে তারা শুধু ফুল নয়, প্রকৃতির এক নিঃশব্দ কবিতা হয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছে মোহময় সৌন্দর্য।
বিজ্ঞাপন
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের জুমাপুর গ্রামে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় এমনই মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

স্থানীয়দের ভাষায়, কাউয়াদীঘি হাওর যেন প্রকৃতির এক নিখাদ বিস্ময়। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকজুড়ে লাজুক মুখ তুলে দাঁড়িয়ে থাকা লাল শাপলারা একবার চোখে পড়লেই হৃদয়ে গেঁথে যায়। সেই মোহেই দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। কেউ বন্দি করেন ক্যামেরায়, কেউ হারিয়ে যান নিঃশব্দ প্রশান্তির গভীরে। হাওরের সৌন্দর্য যেন প্রতিবার নতুন রূপে মেলে ধরে, মুগ্ধ করে, মাতিয়ে তোলে।
কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের জুমাপুর ছাড়াও বানেশ্বরী, রায়পুর, রসুলপুর, কাদিপুরসহ অন্তেহরি এলাকার বিস্তীর্ণ মাঠে দেখা যায়-হেমন্তের সকালে স্থানীয়রা কেউ ফসলি জমিতে, কেউবা মাছ ধরতে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন।
বিজ্ঞাপন

শহর থেকে আসা প্রকৃতিপ্রেমী আমির মিয়া বলেন, ‘লাল শাপলা হাওরের শোভা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্বচ্ছ জলে যেন কোনো শিল্পী রঙ-তুলির আঁচড় দিচ্ছেন। শাপলার জৌলুস প্রকৃতিকে আরও দৃষ্টিনন্দন করে তোলে। এমন দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি করতেই এসেছি।’
পরিবেশকর্মী আব্দুর রব বলেন, ‘জুমাপুর গ্রামের পুরো ফসলের মাঠের চারদিকে ফুটে থাকা শাপলার লাল রং প্রকৃতির সঙ্গে মিশে একাকার হয়ে গেছে। শাপলা গ্রামবাংলার প্রকৃতির এক অনবদ্য রূপ। আগে এ এলাকায় এমন বিস্তীর্ণ শাপলার সমাহার দেখা যায়নি।’
রায়পুর গ্রামের ষাটোর্ধ্ব অখিল সূত্রধর বলেন, ‘আমার নিজের ধানির জমিতে এত শাপলা কখনো দেখিনি। ছোটবেলা থেকেই এ গ্রামে আছি। কিছুদিন আগেও এখানে হাওরের জল ছিল, এখন অনেকটা নেমে গেছে। সেই নরম মাটিতেই শিকড় ছড়িয়ে ফুটেছে শাপলারা।’

শিক্ষক জাহাঙ্গীর জয়েস বলেন, ‘হাওরে পানির কমতি নেই। সেই স্বচ্ছ পানির ওপর ভাসছে লাল শাপলার সৌন্দর্য। এটি যেন এক অপরূপ ছবির ক্যানভাস-রূপসী বাংলার শাশ্বত চিত্র। ভোরে শাপলার পাপড়িতে শিশিরের ছোঁয়া সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়। তাই কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ে আসি; প্রকৃতির রূপ দেখে মন ভরে যায়।’
মৌলভীবাজার সদরের হাওর রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি আলমগীর হোসেন বলেন, ‘কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের কৃষিজমিতেও শাপলা জন্মেছে। কিছুদিন পরেই এসব জমিতে বোরো ধানের আবাদ হবে। শাপলার পাতা ও কাণ্ড পচে গেলে মাটিতে জৈব পদার্থ হিসেবে কাজ করবে। এই ফুল আমাদের দেশের হাওর, বিল ও দিঘিতে বেশি ফোটে।’
প্রতিনিধি/এমআই

